নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মেঘলা দিনে দিক হারিয়ে ফেলা বা মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কবুতর বরাবরই অনন্য। যুগ যুগ ধরে মানুষ বার্তা আদান-প্রদানের কাজে পায়রা ব্যবহার করলেও তারা ঠিক কিভাবে দিক নির্ণয় করে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে গত এক শতাব্দী ধরে এক রহস্য ছিল। তবে সম্প্রতি প্রখ্যাত গবেষণা পত্রিকা ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা এই রহস্যের এক চমকপ্রদ সমাধান নিয়ে এসেছে। গবেষকদের দাবি, পায়রা তাদের চোখের আলো-সংবেদনশীল অণু, ঠোঁট বা ভেতরের কানের সাহায্যে নয়, বরং তাদের ‘যকৃৎ’ বা লিভারের মাধ্যমে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে পথ চেনে।
জার্মানির ‘ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার’ এবং ‘ইউনিভার্সিটি অব বন’-এর গবেষকরা পায়রার বিভিন্ন অঙ্গ পরীক্ষা করে তাদের যকৃতে একটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় সঙ্কেতের সন্ধান পেয়েছেন। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বনের গবেষক ক্রিশ্চিয়ান কুরটস জানান, পায়রার লিভারে থাকা বিশেষ কিছু রোগপ্রতিরোধক কোষ (ইমিউন সেল) লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে আয়রন বা লোহা জমা করে। পরীক্ষার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা যখন পায়রার শরীর থেকে সাময়িকভাবে ওই ইমিউন কোষগুলো অপসারণ করে তাদের উড়িয়ে দেন, তখন দেখা যায় পাখিগুলো সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে এবং নিজেদের পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
গবেষণার সহ-লেখক ক্লিভিয়া লিসোভস্কি জানান, এই ইমিউন কোষগুলো লিভারের স্নায়ুতন্তুর খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্নায়ুর মাধ্যমেই তারা দিক নির্ণয়ের চৌম্বকীয় অনুভূতি মস্তিষ্কে পাঠায় এবং পায়রাকে পথ চলতে সাহায্য করে। তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই কোষগুলো সরিয়ে নেয়ার পরও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পায়রাগুলোর পথ চিনতে সমস্যা হয়নি; কারণ তারা দিক নির্ণয়ে সূর্যের সাহায্যও নেয়। কেবল মেঘলা দিনেই তাদের এই অভ্যন্তরীণ চৌম্বক কম্পাস সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে যায়।
গবেষকদের ধারণা, ইঁদুরসহ অন্যান্য পাখি এবং প্রাণীরাও হয়তো এই একই ধরনের লিভার-ভিত্তিক অভ্যন্তরীণ জিপিএস ব্যবহার করে। তবে অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সঙ্কেত কিভাবে মস্তিষ্কে পৌঁছায় তা নিশ্চিত হতে আরো গবেষণার প্রয়োজন। কেননা এই ধরনের আয়রন সমৃদ্ধ ইমিউন কোষ পায়রার ঠোঁট এবং প্লিহাতেও (স্লিন) পাওয়া গেছে। পশু রোগতত্ত্ববিদ সাইমন স্পিরো এবং জীববিজ্ঞানী হ্যাল ড্রেকস্মিথের মতে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া বা নির্দিষ্ট গন্তব্য খোঁজার মতো ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য পাখিরা হয়তো একাধিক কৌশল বা অঙ্গ ব্যবহার করে থাকে। অন্ধকার রাতে নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য একাধিক পথ জানা থাকাটাই তো স্বাভাবিক।



