বিশেষ সংবাদদাতা
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৪৮৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেছে। মোট ব্যয়ের মধ্যে ৩৯০ দশমিক ৮৪ কোটি টাকা সরকারিভাবে জোগান দেয়া হবে এবং বাকি ৯২ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ বা অনুদান থেকে আসবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের একনেকের নবম এবং বর্তমান সরকারের প্রথম সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। সচিবালয়ে গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ দিকে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগের সরকারের একনেকে নেয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীরকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একনেকের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
জানা গেছে, একনেক সভাটি মাঝপথে মুলতবি করা হয়েছে। একনেকের কার্যতালিকায় ১৯টি প্রকল্প থাকলেও তালিকার ৮ম প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলাকালেই সভা মুলতবি করা হয় এবং প্রকল্পগুলো নিয়ে আগামী একনেকে আলোচনা হবে বলে জানানো হয়। একনেক সভাসূত্রে জানা গেছে, তালিকার প্রথম সাতটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটি সংশোধিত প্রকল্প ও দুইটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া তালিকার এক নম্বর ও চার নম্বরে থাকা করতোয়া নদীর ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প ও অংশীদারিত্বমূলক পল্লী উন্নয়ন ৪র্থ পর্যায় (পিআরডিবি-৪) প্রকল্প দু’টি অনুমোদন না দিয়ে ফেরত দেয়া হয়েছে।
একনেকে অনুমোদন পাওয়া পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, ৩৬৮ কোটি টাকা ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২; চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট-৪, প্রকল্পটিতে ৩.৪৮ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে সংশোধন করা হয়েছে। ১১১৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন (কম্পোনেন্ট-২), এবং দেশের আটটি বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে।
চতুর্থবারের মতো মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ৫৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ের আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (তৃতীয় সংশোধিত) প্রকল্প ও ১৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প।
একনেকে তালিকায় ছিল কিন্তু আলোচনা হয়নি, এমন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলাবিশিষ্ট নতুন অফিস ভবন নির্মাণ; স্থানীয় সরকার বিভাগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন; চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসিক নিবাস নির্মাণ; ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ; প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সঙ্কট নিরসনে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বৈরাগীপুর (বরিশাল)-টুমচর-বাউফল (পটুয়াখালী) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প; বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর জাতীয় মহাসড়কের বরিশাল (চরকাউয়া) হতে ভোলা (ইলিশা ফেরিঘাট) হয়ে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত সড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প; বরিশাল (দিনারেরপুল)-লক্ষ্মীপাশা-দুমকী জেলা মহাসড়কের ১৪তম কিলোমিটারে রাঙ্গামাটি নদীর ওপর গোমা সেতু নির্মাণ প্রকল্প; সীমান্ত সড়ক (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) নির্মাণ প্রকল্প-২য় পর্যায়; এবং ‘ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচটি জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্প’।
একনেকের বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যাপক মূল্যায়ন করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার লক্ষ্য হলো অপচয়মূলক ব্যয় দূর করা এবং জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমির এ কমিটির আহ্বায়ক। কমিটি সেসব প্রকল্প পর্যালোচনা করবে যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত হয়েছে অথবা যেগুলোর ব্যয় বারবার বেড়েছে। নাগরিকদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য এ হিসাব-নিকাশের নিষ্পত্তি অপরিহার্য।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কোন প্রকল্পগুলো বাতিল করা উচিত, কোনগুলোর মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য কোন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত, তা চিহ্নিত করার জন্য কমিটিকে বলা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ব্যয় করা প্রতিটি টাকাই বাংলাদেশের জনগণের। তিনি উল্লেখ করেন যে, অতীতের অনেক প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কমিটির কাজের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্পগুলোর বর্তমান জট পরিষ্কার করা। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমির উল্লেখ করেন যে, সরকার প্রধানের নির্দেশনায় গঠিত নতুন কমিটি এ প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা এবং সেগুলো চালিয়ে যাওয়া উচিত কি না তা নির্ধারণ করতে সেগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে।
উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন যে, সরকার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে সরে এসে এমন একটি ব্যবস্থার দিকে যেতে চায় যেখানে জনগণের অর্থ কঠোরভাবে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রকল্প ব্যয়ের ইতিহাসে প্রায়ই জবাবদিহিতার অভাব দেখা গেছে এবং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে প্রায়ই ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, যদি এডিপির গুণগত মান ও বাস্তবায়নের হার না বাড়ে, তাহলে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমতে থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, মূলধনী ব্যয় স্থবির থাকার কারণে সম্প্রতি প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী চাপের সম্মুখীন হয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন যে, অতীতে প্রকল্পগুলোকে প্রায়ই দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা দলীয় কর্মীদের সুবিধা দেয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো নির্বাচনী ইশতেহার এবং জন প্রতিশ্রুতিগুলোকে একটি জাতীয় কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করা। তিনি আরো বলেন, পর্যালোচনা কমিটির লক্ষ্য হলো প্রতিটি প্রকল্প যেন জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের ম্যান্ডেটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করা।



