নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা, আকাক্সক্ষা নিয়ে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে আছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আগামী দিনের আমাদের কাজগুলো হবে এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। আল্লাহর দরবারে রহমত কামনা করি- যাতে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের তৌফিক দেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ইফতার মাহফিলে তিনি এ কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, আমরা দেশের একটি গুারুত্বপূর্ণ সময়ে আজ এখানে সবাই একত্র হয়েছি। কিছুদিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। যে গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের মানুষ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অকাতরে জীবন দিয়েছেন। বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতন, গুম, খুনের শিকার হয়েছেন। এত ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে। এই ত্যাগের মাধ্যমে, হাজারো মানুষের অত্যাচারের মাধ্যমে আমরা আমাদের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার সুযোগ পেয়েছি। সেজন্য আসুন আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি।
ইফতার মাহফিলে তাকে দাওয়াত দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমানসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
মাহফিলে সভাপতির বক্তৃতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, চব্বিশের ৩৬ জুলাই ছাত্র-জনতার বিপ্লবে আমরা দলমত নির্বিশেষে সবাই শামিল হয়েছিলাম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ মাসের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে। সরকার ও সংসদের কাছে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, আমরা গতানুগতিক বিরোধীদল হিসেবে এই সংসদে কাজ করতে চাই না। আমরা চাই এই সংসদ হোক অর্থবহ এবং জনগণের সমস্ত চাওয়া পাওয়ার কেন্দ্র। সরকারি দল তারাও যেমন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, আমরাও বিরোধীদল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই। সরকারের সব সঙ্গত পদক্ষেপে আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় আমরা যদি দেখি সরকার কোনো অসঙ্গত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়েছেন, আমরা প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করব। সরকার আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে জাতি উপকৃত হবে, আমরা কৃতজ্ঞ হবো। সরকার পরামর্শ গ্রহণ না করলে বিরোধী দলের যে ভূমিকা সেটিই আমরা পালন করব। আমরা জাতির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবো। আমরা এই সদিচ্ছা ও ধারণা রাখতে চাই যে- সরকার সংসদকে আগামীতে এগিয়ে যাওয়ার বাহনে পরিণত করবে। কোনো বাহন কখনো এক চাকায় চলে না, দুটো চাকা মিনিমাম লাগবে। সরকারি দল সামনের চাকা হলে বিরোধী দল হবে পেছনের চাকা।
তিনি আরো বলেন, আমরা পথচলায় সমন্বয় চাই। পারস্পরিক সম্মানের জায়গাটা চাই। মহান জাতীয় সংসদের এক সেকেন্ডও নষ্ট হোক-আমরা তা প্রত্যাশা করি না। জাতীয় সংসদ হবে দেশের সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। যে সমস্ত কালো আইন আমাদের সংবিধানে রয়ে গেছে, সেগুলো দূর করতে আমরা সম্মিলিতভাবে প্রয়াস চালাব। জাতিকে সম্মানিত জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে দাঁড় করানোর জন্য যে আইন সংযোজনের প্রয়োজন আমরা প্রত্যাশা করব সরকারি ও বিরোধীদল সেভাবে এগিয়ে যাবো। তাহলে অতীতের হতাশার যে রাজনীতি জাতিকে গ্রাস করে আছে তার কড়াল গ্রাস থেকে এ জাতি আশা করি মুক্তি পাবে, ইনশা আল্লাহ। এ সময় জামায়াত আমির ৪৭, ৫২, ৭১ ও ২০২৪ এর বীরদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ ও জুলাই আন্দোলনে আহতদের সুস্থতা এবং বীরত্বগাথা জীবন নিয়ে তাদের বেঁচে থাকার তাওফিক কামনা করেন।
বক্তব্যের শুরুতে ডা: শফিকুর রহমান ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতির জন্য একটি ‘কালো দিন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, আজকের এই দিনে বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীকে একটি সাজানো রায়ে দণ্ড দেয়া হয়েছিল। এর প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এলে তৎকালীন সরকার নির্বিচারে গুলি চালিয়ে একদিনে ৭০ জন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে ১৬৪ জনকে হত্যা করেছিল। এই ক্ষত আমাদের মন থেকে কোনো দিন মুছবে না।
জামায়াত আমির দলের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, ২৪ এর ফ্যাসিবাদ যে এভাবে বিদায় নেবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। আমাদের সিংহশাবক ছাত্ররা এবং জুলাই যোদ্ধারা এ অসাধ্য সাধন করেছে। যারা শহীদ হয়েছেন আল্লাহ তাদের কবুল করুন এবং যারা আহত ও পঙ্গু অবস্থায় আছেন, জাতি তাদের চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।
বক্তব্যে জামায়াত আমির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ২০১৩ সালের সেই হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সিঙ্গাপুরে ছিলেন। ফিরে এসে তিনি এটিকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে হরতাল ঘোষণা করেছিলেন। জেলে থেকে আমরা তার সেই সাহসী ভূমিকা দেখেছি। আমরা দোয়া করি আল্লাহ তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন।
রমজানের তাৎপর্য তুলে ধরে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, রমজান আমাদের তাকওয়া বা খোদাভীতির শিক্ষা দেয়। যার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে, তার হাতে কখনো জনগণের আমানতের খেয়ানত হতে পারে না। আমরা যেন এই শিক্ষা ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে ধারণ করতে পারি। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঞ্চালনায় ও কারি বেলাল হোসাইনের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। মুনাজাত পরিচালনা করেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক।
মাহফিলে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেন, জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এমপি, মাওলানা শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, লেবারপার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, ইসলামী ঐক্যজোটের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা হাসনাত আমিনী, খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, গণ-অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক আহমেদ, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, সংগ্রাম সম্পাদক আজম মীর শাহীদুল আহসান, যুগান্তর সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদার, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজ, ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুণ জামিল প্রমুখ। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমপি ও নেতৃবৃন্দ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও সংসদ সদস্যরা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সাবেক বিচারপতি ও সিনিয়র আইনজীবী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, ওলামা-মাশায়েখ, কবি সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইফতার মাহফিলে অংশ নেন।



