বসন্তের সাজে প্রকৃতি : মুহিব্বুল্লাহ কাফি

Printed Edition
বসন্তের সাজে প্রকৃতি : মুহিব্বুল্লাহ কাফি
বসন্তের সাজে প্রকৃতি : মুহিব্বুল্লাহ কাফি

ঋতুর রদবদলে আসে প্রকৃতিতে ভিন্ন সাজ। ছয় ঋতুর এই দেশে নতুন নতুন রূপে সেজে উঠে এই বাংলা। এই তো গেল শীত। শীতে শুষ্কতায় লেপ্টে ছিল জীবন, প্রকৃতি। হিমধরা শীতে যেমনি জীবজন্তুর হাড় কাঁপিয়ে দেয় তেমনি গুটিয়ে আসে প্রকৃতির চারপাশ। গাছগুলো তার অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়। নিষ্প্রাণ পাতাহীন গাছগুলোর কাণ্ড শুকিয়ে কড়কড় করে ভেঙে পড়ে। ফুলের তো প্রশ্নই উঠে না। কেমন যেন প্রকৃতিও শীতের রুক্ষতায় জমে থাকে। কিন্তু শীতের পরই প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন চোখে পড়ে। চারদিকে ফাল্গুনের শুরুতেই বসন্তের ছোঁয়া লেগে যায় গাছে-গাছে। ফুলে-ফসলে। প্রকৃতিতে প্রাণচাঞ্চল্যের বাতাস বয়ে দেয় ঋতুরাজ বসন্ত। প্রকৃতি আবারো সেজে উঠে আপন সাজে। রাঙিয়ে তুলে চারপাশ। গাছে-গাছে সবুজ পাতা ধরে। গাছের কাণ্ডগুলো সজীবতা ফিরে পায়। সবুজ কচি পাতা গজায়। কুঁড়ি ফোটে। ফাল্গুন শেষে আসে চৈত্র। বসন্ত যেন তার সবটুকু রূপ ঢেলে দিয়ে সাজিয়ে তুলে প্রকৃতিকে। গাছে-গাছে ফুল ফোটে। ফুলের মোহনীয় সৌন্দর্যের অপার বিস্তার ঘটে। বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন ফুলের গন্ধ সোনারোদে মৌ মৌ করে ওঠে। চারদিকে বসন্তের স্নিগ্ধ সুষমায় ভরা বাহারি রঙ, রকমারি ফুলের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করে। বসন্ত এসেছে সাহিত্যের পাড়ায়ও। কবিরা তাদের কবিতায় বসন্ত ফুটিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির মাধ্যমে। সাহিত্যিকরা তাদের কলমের তুলিতে এঁকে দিয়েছেন বসন্তের নয়রাভিরাম দৃশ্য। কবি রবীন্দ্রনাথও বসন্তের প্রেমে পড়ে লিখে গেছেন- ‘আহা আজি এ বসন্তে, কত ফুল ফোটে। কত পাখি গায়। আহা আজি এ বসন্তে।’ ছয় ঋতুর শেষ ঋতু বসন্তের ফুলের মধ্যে পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, নয়নতারা, কনকচাঁপা, গাঁদা, চাঁপা, ডালিয়া, নাগকেশর, গন্ধরাজ অন্যতম। বনের বা বাগানের আগুন বলা হয় পলাশকে। নজরকাড়া এ ফুলটি গাছের শাখায় শাখায় লাল ও কমলা রঙের আগুন ধরিয়ে দেয়। সাহিত্যেও বেশ জায়গা করে নিয়েছে পলাশ ফুল। তার মধ্যে ঔষধি গুণও রয়েছে ঢের। বসন্তের অন্যতম সৌন্দর্য শিমুল। শীতে সবকটা পাতা ঝরে গেলেও ফাল্গুনের ফুল ফোটে। ধীরে ধীরে লাল টুকটুকে রঙ ধরা শিমুল ফুলে মানুষ তো বটেই পাখিরাও মেতে উঠে। শাখায় বসে কলরব তোলে। শিমুলও সাহিত্যে তার আসন পেতে বসেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লাল বর্ণের শিমুল ফুলে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘শিমুলের কুঁড়ি, এক রাত্রে বর্ণবহ্নি জ্বলিল সমস্ত বনজুড়ি।’ বসন্ত মৌসুমে সৌন্দর্যের দূত হলো কৃষ্ণচূড়া। শীতের বাগড়ায় বিষণœবদনে দাঁড়িয়ে থাকে একমনে। ঝরে পড়ে সব পাতা। কিন্তু মাঘমাসের শেষের দিকেই কৃষ্ণচূড়া কাণ্ডে কাণ্ডে সবুজ পাতা গজায়। সজীবতা ছড়িয়ে মগডালে লাল লাল অগ্নি উঁকি দেয়। ধীরে ধীরে কৃষ্ণচূড়ার শাখায় শাখায় লাল আগুন ধরিয়ে দিয়ে ফুলের চারটি পাপড়ি মেলে ধরে। কৃষ্ণচূড়া বসন্তের সাজে সজ্জিত হয়ে প্রকৃতিকে রঙিন করে তোলে। সজীব হয়ে ওঠে আশপাশ। অপরূপ রূপে সেজে উঠা কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে বসন্তের কোকিল এসে বসে। তার মধুর কুহুতানে মুখরিত হয়ে উঠে বাড়ির উঠোন কিংবা স্কুল-কলেজ-মাদরাসার আঙিনা।

একইভাবে নয়নতারা, কনকচাঁপা, ডালিয়া, গাঁদা, নাগকেশর, গন্ধরাজ প্রভৃতি ফুল বসন্তের ঢেউ লেগে দোলে ওঠে। লাল-নীল, বেগুনি; বাহারি রঙে প্রকৃতিকে জানিয়ে দেয় বসন্ত এসে গেছে। মৌ মৌ করা ফুলের গন্ধে বুলবুলি, দোয়েল, কোকিলের কলরবে গাছে-গাছে উৎসব বসে। পাখিদের মিতালিতে মুখরিত হয়ে উঠে চারপাশ। বসন্তের ফুলগুলোর ছোঁয়ায় এভাবেই প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পায় বাহারি ফুলের সৌরভে। ফুলে ফুলে বাগানও সেজে ওঠে এই বসন্তে। ফাল্গুনের শেষে আম-জাম, কাঁঠাল গাছগুলোতে সবুজ পাতা আসে। মুকুল উঁকি দেয়। চৈত্র মাসের শুরুতেই ফল গাছের মুকুলগুলো পরিপক্বতা পায়। ফুলে ফলে ছেয়ে যায় বাগান। সরিষার ফুল সোনালি গালিচা বিছিয়ে দেয় ক্ষেতজুড়ে। দিগন্তবিস্তৃত মিষ্টি রোদে মৃদু বাতাসে সোনারঙা ফুলগুলো দুলতে থাকে আপন মনে। ভোমর, মৌমাছিরা ফুলে ফুলে মধু আহরণে ব্যস্ত। বসন্তের রূপে সেজে ওঠে প্রকৃতি। বসন্তের এমন মনকাড়া দৃশ্য বিমোহিত করে যে কাউকে।