বিশেষ সংবাদদাতা
ইরানের সাথে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরুর ৪০ দিন পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। এরপর স্থায়ীভাবে যুদ্ধ থামাতে আলোচনা চলাকালেই তার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, কুয়েত ও আবুধাবিতে ফের ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অতর্কিতে হামলা হলে সেটিতে আগুন ধরে যায়।
গতকাল সকালের দিকে (স্থানীয় সময়) এই হামলার ঘটনা ঘটলেও এতে ক্ষয়ক্ষতি কেমন হয়েছে তা জানা যায়নি।
তবে ‘অদৃশ্য’ হামলার ঘটনার পর এসব দেশে থাকা সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও প্রবাসী লাখ লাখ বাংলাদেশীর মধ্যে ফের নতুন করে যুদ্ধ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা জানান, মনে করেছিলাম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। কিন্তু এখন দেখছি ঝুঁকি রয়েই গেছে। যেকোনো সময় পরিবেশ অশান্ত হতে পারে। যদিও কুয়েতের জীবনযাত্রা বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে।
গতকাল ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে নতুন করে তিন দেশে হামলার ঘটনা প্রকাশিত হয়। তাদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী ইরান থেকে ছোড়া কমপক্ষে দু’টি ড্রোনকে নিজেদের আকাশে শনাক্তের পাশাপাশি বাধা দিয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের এসব প্রকাশ্য হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন পর্যন্ত মোট ৫৫১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দুই হাজার ২৬৫টি ড্রোন হামলা মোকাবেলা করেছে। একই দিনে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রোববার আবুধাবি থেকে দেশটির জলসীমায় প্রবেশ করা একটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে জাহাজটির কিছু অংশে আগুন ধরে যায়। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, রোববার সকালে আবুধাবি থেকে আসা পণ্যবাহী ওই বাণিজ্যিক জাহাজ মেসাইদ বন্দরের উত্তর-পূর্ব দিকে কাতারের জলসীমায় ড্রোন হামলার শিকার হযেছে। এই ঘটনার ফলে জাহাজে সীমিত পর্যায়ে আগুন ধরে গেলেও কেউ আহত হননি। এ ছাড়া কুয়েতের সামরিক বাহিনী রোববার ভোরের দিকে তাদের দেশে ড্রোন হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ এক্সে দেয়া এক বার্তায় জানিয়েছে, রোববার ভোরে সশস্ত্রবাহিনী কুয়েতের আকাশসীমায় বেশ কিছু শত্রু ড্রোন শনাক্ত করেছে। এসব ড্রোনকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মোকাবেলা করা হয়েছে। তবে ড্রোনগুলো কোত্থেকে এসেছে সেই বিষয়ে কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।
গতকাল সন্ধ্যার পর কুয়েত সিটির এক প্রবাসী বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, মনে করেছিলাম যুদ্ধের পরিবেশ শান্ত হচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে আবারো আজকে (রোববার) ভোরে হামলা হয়েছে। যদিও কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ড্রোন হামলা আকাশে থাকতেই মোকাবেলা করেছে। এই অবস্থায় নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য অস্থির হওয়ার কোনো আশঙ্কা দেখছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে এখানে আন্তর্জাতিক লড়াই চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে আসলে শাস্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঝুঁকি রয়েই গেছে বলে মনে হচ্ছে। এক মাস হয় যুদ্ধ বন্ধ রয়েছে বলা হলেও বাস্তবে মাঝে মধ্যে হামলার ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। আজকে আবার প্রকাশ্যে ঘটলো তাও তিন দেশে! বাংলাদেশীদের প্রতিক্রিয়া কী এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন আমাদের আল্লাহ্র ওপর ভরসা করে থাকতে হবে। কুয়েতের স্থানীয় বাসিন্দারা এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে কী ভাবছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কুয়েতিদের বেশির ভাগ ইরানের পক্ষে থাকলেও কিছু অংশ আবার ইসরাইলের পক্ষে আছে। তবে বেশির ভাগ কুয়েতি ইসরাইলের পতন চাচ্ছেন। যদিও এই ব্যাপারে কুয়েত সরকারের বক্তব্য ছাড়া কোনো মূল্য নেই। অপর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, কুয়েতে হামলার ঘটনা ঘটলেও পুরো কুয়েতের অফিস আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই স্বাভাবিক রয়েছে। বাংলাদেশীরা ঈদকে সামনে রেখে দেশে নিয়মিত টাকা পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরের দিকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে। এর পাল্টা হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, দুবাই, লেবানন, ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল ও ড্রোন হামলা করে ইরান। এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত এক নারীসহ আট বাংলাদেশী নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন। তাদের বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব নয়া দিগন্তকে জানান, তারা প্রতিদিন মনিটরিং সেল থেকে যেসব সমস্যার কথা জানতে পারছেন সেগুলো যাচাই বাছাই করে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সমস্যাজর্জরিত কর্মীদের নিয়ে শেল্টার হোম খোলার চিন্তা করা হলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এটাকে ভালো চোখে দেখছে না।



