অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রেখেছে দেশের পুঁজিবাজার। এর ফলে গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে আবারো পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি। এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী কার্যদিবসে পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছিল সূচকটি। কিন্তু পরবর্তীতে টানা সংশোধনের ফলে সূচকটির ২৩৫ পয়েন্টে বেশি অবনতি ঘটেছিল। গত ক’দিন ধরে সূচকের উন্নতির ফলে আবার আগের জায়গায় পৌঁছল সূচকটি।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৫ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ৫৫৪ দশমিক ৮২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬০০ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। বুধবারের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে গতকাল লেনদেনের শুরুতেই দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। লেনদেনের শুরুতেই সূচকটি পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। কিন্তু সূচকের এ অবস্থানে মৃদু বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সাময়িকভাবে নি¤œমুখী আচরণ করে সূচক। এরপর ক্রয়চাপ বাড়তে থাকলে ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি বেলা পৌনে ১১টার দিকে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬১৩ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৫৮ পয়েন্ট। কিন্তু লেনদেনের শেষদিকে এসে সমন্বয়ের কারণে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি অংশ হারায় বাজারটি। এ সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৬০ ও ১০ দশমিক ২৫ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১২৮ দশমিক ২০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৬৫ দশমিক ০১ ও ৬৯ দশমিক ৯১ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতি গতকাল দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনে প্রভাব ফেলে। ঢাকা শেয়ারবাজার এদিন ৯৪৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৮২ কোটি টাকা বেশি। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৬৫ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ১৩ কোটি টাকা থেকে ১৯ কোটিতে পৌঁছে যায় দিনের লেনদেন।
দিনের বাজার আচরণকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। অনেকে এ আচরণকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের কারণ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, আগের গভর্নর আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু ভালো কাজ করলেও বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে তার সিদ্ধান্তে বিশাল লোকসানের মধ্যে পড়ে গেছেন বিনিয়োগকারীরা। যেখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অব্যবস্থাপনার সাথে তাদের ন্যূনতম সম্পর্কও ছিল না সেখানে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর কষ্টার্জিত পুঁজিকে শূন্য ঘোষণা করা ভালোভাবে নেননি বিনিয়োগকারীরা। হয়তো এ কারণেই তার বিদায় এবং নতুন গভর্নর নিয়োগের খবরে ইতিবাচক আচরণ করছে বাজার।
এদিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাটির নিরীতি হিসাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ভুয়া অগ্রিম আয়কর দেখিয়ে প্রায় ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এই গুরুতর অনিয়ম ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বিএসইসি।
রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অধীনে থাকা ১২টি ফান্ডের মধ্যে ছয়টিতে এই আর্থিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। ফান্ডগুলো হলো আইএফআইসি ব্যাংক, ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড এবং এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী মিউচুয়াল ফান্ডের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এই ফান্ডগুলোর ব্যালান্স শিটে বিপুল অঙ্কের অর্থ অগ্রিম আয়কর হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা নিরীকের নজরেও এসেছে।
বিএসইসির অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১১-২০১২ অর্থবছর থেকেই মিউচুয়াল ফান্ডের আয় করমুক্ত ঘোষণা করেছে সরকার। এনবিআরের বিভিন্ন পরিপত্র ও এসআরও-তেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করমুক্ত এই আয়ের বিপরীতে ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর পরিশোধের দাবি করলেও এর সপে কোনো ব্যাংক সার্টিফিকেট, স্টেটমেন্ট বা চালানের কপি জমা দিতে পারেনি। বরং মাত্র ২৮ লাখ ১৮ হাজার টাকা রিফান্ডের জন্য ব্যাংকে আবেদনের কিছু নথিপত্র জমা দিয়ে দায় সারার চেষ্টা করেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা মনে করছে, করমুক্ত আয়ের বিপরীতে কাল্পনিক অগ্রিম আয়কর প্রদর্শন করা কেবল বিনিয়োগকারীদের অধিকার হরণ নয়, বরং এর আড়ালে অর্থপাচারের মতো দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এই অর্থ কোথায় সরানো হয়েছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা বিস্তারিত তদন্তের জন্য দুদক ও এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো পত্রে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএসইসির প থেকে জানানো হয়েছে যে, শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রায় কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। যথাযথ প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি থাকায় এই জালিয়াতির বিষয়টি এখন উচ্চতর তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। বাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিএসইসি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল থাকবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।



