আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত

সংশোধন টেকসই হবে না, গণরায়ের ভিত্তিতে সংবিধানের সংস্কার জরুরি

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
সংশোধন টেকসই হবে না, গণরায়ের  ভিত্তিতে সংবিধানের সংস্কার জরুরি
সংশোধন টেকসই হবে না, গণরায়ের ভিত্তিতে সংবিধানের সংস্কার জরুরি

সংবিধান সংস্কার ও সংশোধন নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা মনে করছেন আলোচনার ক্ষেত্রে সরকারের যে ব্রুটাল মেজরিটি আছে তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনে সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নাই। আবার কেউ কেউ মনে করছেন সংবিধান সংস্কারে গণরায় মুখ্য, সরকারের উচিত ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংবিধানের কাক্সিক্ষত সংস্কার বাস্তবায়ন করা। আর সংবিধানের সংশোধন করা হলে অতীতের মতো ভবিষ্যতে আদালতে বিষয়টি গেলে তা বাতিল হয়ে যাওয়ার একাধিক নজির রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ তাই হবে বলে আইনজীবীরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন। এমনকি আইনজীবীরা সতর্ক করে বলেছেন সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনায় বসলে বিরোধী দলের রাজনীতি ডাস্টবিনে যাবে। বিরোধীদল জনগণের সম্পৃক্ততা হারাবে। একই সাথে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধীদলের বসা উচিত, কথা বলা উচিত যাতে তা রেকর্ড থাকে এবং জনগণ তা জানতে পেরে সংবিধান সংস্কারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিএনপির সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, সংবিধান সংস্কারে সমন্বয় সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের ওপর নির্ভর করে। বিএনপি তো একটা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। বিরোধীদল থেকে প্রতিনিধি দেয়ার কথা, তারা তো এখনো দেয়নি। তারা প্রতিনিধি দিলে বা তাদের সংস্কার প্রস্তাব বিশেষ কমিটিতে এলে তা পরীক্ষা করে দেখবে এ কমিটি। তারপর এটা পার্লামেন্টে যাবে। সুতরাং বল এখন বিরোধীদলের কোর্টে।

এদিকে সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, ধোঁকাবাজি বললে শব্দটি খারাপ দেখাবে। মূল কথা হচ্ছে তিনটি, প্রথমত জুলাই সনদ, জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ ও জুলাই সংস্কার আদেশ। জুলাই সংস্কার আদেশের ভিত্তিতে গণভোট। পার্লামেন্টে সরকারি দল বারবার বলছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। আবার পার্লামেন্টে বলা হচ্ছে জুলাই সনদ না, গণভোটে রাজি না হলে ভোট হতো না। এর মানে জুলাই সনদ ততটুকু বাস্তবায়ন করব যতটুকু আমার পক্ষে।

দ্বিতীয়ত গণভোট দেয়ার পরে জুলাই সনদকে পরিবর্তন করার কোনো অধিকার সরকারের নাই। কারণ জনগণ তো ম্যান্ডেট দিয়ে দিয়েছে। গণভোটকে কি রিডানডেন্ট ঘোষণা করলেন কোনো আইনের দ্বারা? না। তাহলে পুরো প্রসেসটাই অবৈধ যদি ধরেন কনস্টিটিউশনের অধীনে করবেন।

তিনি বলেন, সরকার কমিটির নাম দিয়েছেন সংশোধন। সংশোধন আর অ্যামেন্ডমেন্ট তো এক জিনিস না। সংশোধন করতে চাইলেও কনস্টিটিউশনের মধ্যে সম্ভব না। সংশোধন করে নতুন করে গণভোট দেবেন, সে বিধানও নাই। অস্টম সংশোধনীতে এ বিধানটাও নাই। যা কিছু করছেন প্রতিটি জিনিস আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে করতে চাচ্ছেন। এ কারণে সরকার কোনো এক্সপ্লানেশন দিতে পারছে না।

তৃতীয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জুলাই সনদ হয়েছিল ঐকমত্যের ভিত্তিতে। আজকে সংবিধান সংশোধন নিয়ে যা করতে চাইছে তা ঐকমত্যের ভিত্তিতে নয়। যে কারণে জামায়াত যোগ দেয়নি। এনসিপিও মোস্টপ্রব্যাবলি যোগ দেবে না। তাহলে পার্টি মেজরিটিতে বাকশাল যেভাবে গঠিত হয়েছে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি হবে। আপনি পুনরাবৃত্তি করার ম্যান্ডেট তো পাননি। বিএনপির ৩১ দফার প্রথম দফায় সংস্কার লেখা আছে সংশোধন লেখা নাই। মেজরিটি হিসেবে বিএনপি যে ম্যান্ডেট পেল সেখান থেকে দলটি কিভাবে সরে যায়। এটা ইন্দিরা গান্ধীর কেস ছিল। সুপ্রিম কোর্ট যখন বাতিল করে দিয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর ইলেকশনটা তখন এ কথা এসেছিল। এটাকে বলে ফ্রড প্র্যাকটিস আপ অন দি পিপলস ভারডিক্ট। জনগণের যে রায় তার ওপর ফ্রড প্র্যাকটিস করা হচ্ছে। জনগণ আপনাকে এ বিষয়ে কোনো ক্ষমতা ডেলিগেট করেনি। যেটার ওপর ভিত্তি করে মানুষ আপনাকে ভোট দিয়েছে ততটুকু পাওয়ার আপনি এক্সারসাইজ করতে পারেন। জনগণ সংবিধান সংস্কারের জন্যে ভোট দিয়েছে, সংশোধন পাচ্ছেন কোথায়, সে পাওয়ার তো সরকারের নাই। সরকার যা করতে চাচ্ছে তা পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জ হলে নাল অ্যান্ড ভয়েড হতে বাধ্য। পুরো প্রক্রিয়া বা সরকার যেভাবে যাচ্ছে সংবিধান সংবিধান করে একদিন দেখা যাবে এই পার্লামেন্টটাকে অবৈধ ঘোষণা করে দেবে। এখনো সম্ভব যদি গণভোটের আন্ডারে সংবিধান সংস্কার করেন, তা না করলে সব অবৈধ। কারণ আপনি ভোটটা কিসের ভিত্তিতে করেছেন। জনআকাঙ্খাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম একটা অটোক্রেটিক সিস্টেম চালু হয়ে গেল সাংবিধানিকভাবে যেখানে জনগণের ভোটের ৭০ শতাংশ রায়, মেজরিটি রায় দিয়ে সারা বিশ্বে মানুষের ইউনিভার্সাল সফরেজকে ভেঙে চুরমার করে গণতন্ত্রের ডেফিনিশনকে ভূলুন্ঠিত করা হলো। সত্তর শতাংশ মানুষের মতামতকে জোরপূর্বক একটা মেজরিটি দিয়ে আপনি ৫০ শতাংশের ভোটের জোরে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন। এটা পুরো ইলিগ্যাল ও আন ল ফুল।

সুুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনে সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নাই। গণভোটের রায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে, সমন্বয় কিসের? বিরোধীদলের চাওয়ার বিষয় নয়, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এখানে যদি বিরোধীদল অংশ নেয় তো তাদের রাজনীতি ডাস্টবিনে চলে যাবে। গণভোট নিয়েছেন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যে। এখন আইনমন্ত্রী বিরোধীদলকে সংশোধনের প্রস্তাব দেবেন কেন? সেকেণ্ড ওথ নেবেন, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে ওথ নেবেন তারপরে কাজ করবেন।

সঙ্কট নিরসনে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে আলোচনার কোনো পথ আছে কি না জানতে চাইলে আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের কথা ভাবতে হবে। সংবিধান মানলে এখনো বঙ্গবন্ধুর ছবি ঝুলছে না, সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন আপনি তাহলে বঙ্গবন্ধুর ছবি ঝুলছে না কেন? সংসদে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়ে কিভাবে বললেন জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক, সংবিধানে লেখা আছে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক। পুরো জাতির সাথে বাংলাদেশ জন্মের পরে সর্বশেষ বিশ্বাসঘাতকতা হলো এটা। সরকার টু থার্ড মেজরিটি পেয়েছে, বিরোধীদলের চাপে কী আসে যায়? আইনমন্ত্রী যদি বিরোধীদলকে ডেকে বলে; আসেন সংবিধান সংস্কারে সমঝোতা করি, ফাইনালি তো টু থার্ড মেজরিটি যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই গৃহীত হবে। বিরোধীদলের সরকারের এ প্রস্তাবে যাওয়া মানে প্রতি ধাপে ধাপে পঙ্গুত্বের শিকার, টু থার্ড মেজরিটি যখন সরকারের হয়ে গেছে বিরোধীদলের তো কোনো রোল নাই। বিরোধীদল যে আলাপ করবে তাতেই ধরা খাবে। স্ট্রেইট জনরায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন হবে, বিরোধীদল জামায়াত যদি যায় এ আলোচনায়; তারা বিপদে পড়বে বলে আমি মনে করি। তারা জনগণ থেকে সম্পৃক্ততা হারাবে। কেননা টু থার্ড মেজরিটি বিএনপি পেয়েছে এখানে তারা গেলেই কি আর না গেলেই কি? বিরোধীদলকে প্রয়োজন মনে করলে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারে, প্রয়োজন মনে না করলে টু থার্ড মেজরিটির জোরে যে উপায়ে খুশি তা বাস্তবায়ন করতে পারে।

তাহলে কি সংবিধান সংস্কারের দাবি রাজপথে গড়াবে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাকী বলেন, তা তো বলতে পারি না।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিষ্টার ইমরান সিদ্দিকী বলেন, সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনের মধ্যে সমন্বয় হওয়া ডিফিকাল্ট। কারণ এখানে সংশোধন মানে হচ্ছে আপনি ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধানকে সংশোধন করবেন, তো সেজন্যে পার্টিকুলার প্রসিডিউর আছে যেটা অনুসরণ করবেন। এখন সংবিধান সংশোধন করতে গেলে যেটা হয়, আমরা সবাই জানি সংবিধানের মৌলিক কোনো কাঠামোকে পরিবর্তন করা যায় না। সুপ্রিমকোর্টকে বিকেন্দ্রিকরণ, আপার হাউস কিংবা প্রধানমন্ত্রী দুই টার্মের বেশি দায়িত্ব নিতে পারবেন না এসব পরিবর্তন করতে গেলে সেটা বেসিক স্ট্রাকচারের পরিপন্থী হবে। সংবিধানে পরিবর্তন আনলেই সেটা স্থায়ী হবে কি না সে প্রশ্নটা এসেছে। হাইকোর্ট এটাকে অবৈধ ঘোষণা করে দিতে পারে। পঞ্চম, অষ্টম, ষোড়শ সংশোধনীতে এটা দেখেছি। সেজন্যেই বিষয়টা ছিল যে সংসদ সংবিধান পরিষদ হিসেবে বসবে, একটা দ্বৈত ভূমিকা থাকবে, যাতে তারা সংবিধানের মৌলিক কিছু সংস্কার আনতে পারে। যেটা সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারকে এফেক্ট করলেও তা ভ্যালিড থাকবে, যাতে পরবর্তীতে সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ না থাকে।

সরকার বিরোধীদলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটির সদস্য হিসেবে অংশ নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, এ ব্যাপারে অভিমত জানতে চাইলে ব্যারিস্টার ইমরান বলেন, আমি মনে করি বিরোধীদলের উচিত এখানে পার্টিসিপেট করা। যদিও সংবিধান সংশোধনে কোনো ফলপ্রসূ স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। যেগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে এফেক্ট করে যেমন সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রিকরণ, আপার হাউস বা প্রাইম মিনিস্টারের টার্ম লিমিটস। সেক্ষেত্রে আপনি বেসিক স্ট্রাকচারকে অ্যাভয়েড করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন না। তারপরও বিরোধীদলের সরকারের সাথে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকা উচিত, ওনাদের ওখানে যাওয়া উচিত, ওনাদের কথাগুলো বলা উচিত, দরকার হলে নোট অব ডিসেন্ট দেয়া উচিত যাতে পরবর্তীকালে ইতিহাসে এটা একটা রেকর্ড হয়ে থাকে। ভিন্নমত যে ছিল সেটা যেন রিফ্লেক্টেড হয়।

ব্যারিস্টার ইমরান বলেন, বিরোধীদল গেলে জনগণও জানতে পারবে যে আসলে কী হচ্ছে। জনগণের পক্ষ থেকে একটা চাপও সৃষ্টি হবে। পার্লামেন্টের বাইরেও সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধীদল বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটা কমিটি করতে পারে। আমি আগেও এটা বলেছি। সরকারি ও বিরোধীদল বসে যদি মনে করেন এমপিদের বাইরেও কোনো মতামত নিতে চান সেই সুযোগ তো ওনাদের আছেই।

তিনি বলেন, সরকারের হাতে টু থার্ড মেজরিটি থাকলেও বিরোধীদলের সাথে বসে কোনো নতুন কনসেপ্ট বিল্ডআপ করার সুযোগ থাকে তা কাজে লাগতে পারে। সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে জনআকাক্সক্ষার প্রতি আস্থা সৃষ্টি হতে পারে বা টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে সরকারের কোনো একগুঁয়েমি থাকলে সেটাও কেটে যেতে পারে। কারণ যখন সবার সাথে ওনারা বসবেন, আলোচনা করবেন, জনগণের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি হলে সে চাপকে ওনারা রেসপেক্ট করে জনআকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হয় এমন সিদ্ধান্ত নেবেন; এমন আশা তো করাই যায়। সরকারি দল ও বিরোধীদলের লক্ষ্য জনকল্যাণ হলে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব।