২০০৮ এ তারেক রহমানের জামিন সিদ্ধান্তের অন্তরালের কথা জানালেন বিচারপতি জয়নুল

Printed Edition

মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের কৃতী সন্তান, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো: জয়নুল আবেদীন ২০০৮ সালের বহুল আলোচিত এক জামিন শুনানির স্মৃতি নতুন করে তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, সেদিন যদি সাহসের সাথে আইনের কলম না চালাতাম, হয়তো আমরা ভিন্ন এক বাংলাদেশ দেখতাম।

তিনি জানান, ২০০৮ সালে আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিন শুনানিকে ঘিরে আদালতকক্ষে ছিল চাপা উত্তেজনা ও অদৃশ্য চাপ। ওপর থেকে বার্তা ছিল, কোনোভাবেই জামিন নয়। কিন্তু বিচারকের শপথ আমাকে আইন মেনেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

বিচারপতি জয়নুল আবেদীন ১৯৯৬ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ বিচারিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলার দায়িত্ব পালন করেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নিরপেক্ষ অবস্থানের জন্য।

২০০৪ সালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনার তদন্ত-সংক্রান্ত দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ বহু নেতাকর্মী আহত হন। বিচারপতি জয়নুল আবেদীন দাবি করেন, তদন্তের সময়ও নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপ ছিল। তার ভাষ্য, একটি পক্ষ চেয়েছিল বিএনপি ও তারেক রহমানকে সরাসরি জড়িয়ে দিতে। তবে তিনি বলেন, আমি তদন্তে কারো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণকে গুরুত্ব দিয়েছি। যথাযথ তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য।

২০০৮ সালের জামিন শুনানির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, অসুস্থ তারেক রহমানকে আদালতে দেখে তার মনে গভীর মানবিক বোধ জেগে উঠেছিল। আমি জানতাম, সেদিন যদি জামিন না দিতাম, তাহলে তার বড় ক্ষতি হতে পারত। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ আইনি ভিত্তিতে ব্যক্তি বা রাজনীতি নয়। তিনি আরো বলেন, সহবিচারকদের চোখে ছিল চাকরি হারানোর শঙ্কা। আমি বলেছিলাম সে পালাবে কি না, সেটা সরকারের বিষয়। কিন্তু আমরা বিচারক আইন অনুযায়ী জামিন পাওয়ার অধিকার থাকলে দিতে বাধ্য।

স্মৃতিচারণে বিচারপতি বলেন, মরহুম বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে বড় ছেলের মতো স্নেহ করতেন। তিনি বলতেন, জয়নুল, তুমি আমার বড় ছেলের মতো। ওদের দেখে রেখো। একদিন মমতা ভরাকণ্ঠে বলেছিলেন ‘জয়নুল, গেট রেডি, আমি তোমাকে প্রেসিডেন্ট বানাবো। শুনানির সময় তার কানে বারবার সেই কথাগুলো ভেসে আসছিল বলেও জানান তিনি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, আদালতে আমি কেবল আইনকেই প্রাধান্য দিয়েছি।

এই জামিন সিদ্ধান্তের পরবর্তী সময়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বঞ্চনার শিকার হন। জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও প্রধান বিচারপতি হওয়ার সুযোগ পাননি। তবে তার কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে দৃঢ়তাই বেশি। আমি যা করেছি, আইনের শপথ রক্ষার জন্যই করেছি, বলেছেন তিনি।

১৯৫২ সালে দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করেন জয়নুল আবেদীন। পরে চুয়াডাঙ্গা ভি.জে. স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে এসএসসি উত্তীর্ণ হন। কুষ্টিয়া থেকে আইএসসি সম্পন্ন করে খুলনার দৌলতপুরের বিএল কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী আইনবিদদের প্রতিষ্ঠান লিনকোনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। আইন পেশায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের সেই জামিন সিদ্ধান্ত তার কর্মজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। তার দাবি একটাই সেদিন আমি শুধু আইনের শপথ রক্ষা করেছি মাত্র। এ ছাড়া তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে একবার দেখা করতে চাই। শুভকামনা জানাতে চাই। চাই তিনি প্রতিহিংসার বদলে সুশাসন উপহার দিন- এটাই আমার চাওয়া।