চট্টগ্রাম ব্যুরো
সকাল থেকে চটগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটারদের চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস, আনন্দ ও স্বস্তি চোখে পড়েছে তা ছিল অনেকটা ঈদ আনন্দের ন্যায়। একই সাথে নির্বাচনের সামগ্রিক এ পরিবেশ দেশ ও প্রফেসর ড. ইউনূসের মর্যাদাকে বহির্বিশ্বে যেমনি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, তেমনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ফিরে পেয়েছে তাদের হারানো গৌরব এমনটিই বলছেন ভোটাররা।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে দুপুরের পর কেন্দ্রগুলোতে তেমন ভোটার ছিল না বললেই চলে। বেলা ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ভোট পড়েছে গড়ে ৪৫ শতাংশের কিছু বেশি। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই অতিবাহিত হয়েছে পুরো ভোটের সময়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভোটাররা। ভোটের এমন পরিবেশ নিকট অতীতে দেখেননি বলে মন্তব্য করেছেন ভোটাররা।
নগরী ও জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই ভোটাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতীক্ষার ভোট দিতে। সকাল পৌনে ৮টায় লোহাগাড়ার তৈয়ব আশরাফ ভোটকেন্দ্রে দেখা যায় ভোটাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন। তাদের মাঝে কোনো ধরনের বিরক্তির ছাপ তো ছিলই না বরং ছিল উচ্ছ্বাস।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে ১১২টি কেন্দ্রে ভোট দেন ভোটাররা। এ উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সেখানেও বেলা বাড়ার সাথে ভোটার উপস্থিতি বাড়ছিল। এ আসনের সাতজন প্রার্থী থাকলেও ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বিদ্রোহী মোহাম্মদ লেয়াকত আলীর (ফুটবল) এজেন্ট ছিল। বাকিদের এজেন্ট চোখে পড়েনি। বাঁশখালীর উত্তর চাম্বল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো: মাহবুব আলম জানান, এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ২৩৩২ জনের মধ্যে সকাল ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত ১৮০টি ভোট পড়ে। এ কেন্দ্রে কথা হয় ভোট দিতে আসা বৃদ্ধা জাহেদা বেগমের সাথে। তিনি শান্তিতে ভোট দিতে পেরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। একই কেন্দ্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটার সাকিবুল ইসলামকে এক ভিডিপি সদস্যকে কোলে করে নির্দিষ্ট বুথে নিয়ে যেতে দেখা যায়। তার সাদামাটা জবাব ছিল নাগরিক দায়িত্ব হ পালন করতে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দিতে কষ্ট হলেও এসেছি।
আলাওল কলেজসংলগ্ন বাঁশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা ১০টার দিকে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন; বিশেষ করে নারী ভোটারদের। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার মোস্তাক মিয়া জানান, ৪১৩৮ জন ভোটারের মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ৬৫৫টি ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে লাঠিতে ভর দিয়ে ভোট দিতে আসা বয়োবৃদ্ধ আবদুল হক (৮৫) নয়া দিগন্তকে জানান, এবার আল্লাহ সুযোগ দিয়েছেন বিবেকে যেটা চায় সে অনুযায়ী ভোট দেবার। অতীতে সেটা পারেননি। অন্যের সহায়তা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসা আরেক বৃদ্ধ ভোটার রফিক উদ্দিন (৮২) জানান, এবার আল্লাহ দিলে খুব শান্তি লাগছে। এর আগের নির্বাচনে ভোট দিতে এলেও না দিয়ে ফেরত যেতে হয়েছিল ।
বাঁশখালীর আহমদিয়া ডলমপীর (রহ:) সিনিয়র মাদরাসা ভোটকেন্দ্রে ছিল বেলা পৌনে ১১টার দিকে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। সেখানকার প্রিজাইডিং অফিসার মো: লুৎফুর রহমান জানান, মোট ৪১৪৯ জন ভোটারের মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টার পর্যন্ত ৭৭৪টি ভোট পড়ে।
বাঁশখালী বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার বিশ্বনাথ ধর জানান, এ কেন্দ্রে মোট ভোটার তিন হাজার ৬৫ জন। যার মধ্যে এক হাজার ৫৯৬ জন পুরুষ ও এক হাজার ৪৬৯ জন নারী ভোটার। সকালের তিন ঘণ্টায় এ কেন্দ্রে ৫০০টির বেশি ভোট পড়েছে। এ ভোটকেন্দ্রের ৬০ শতাংশই অমুসলিম বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনের চন্দনাইশ সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৭০০। প্রিজাইডিং অফিসার আবুল ফজল মো: মনসুর উল্লাহ জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির মোট ভোটার ২৪০৬ জন। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৭০০, যা শতকরা হিসাবে ২৮ শতাংশের মতো।
চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনের কাঞ্চনাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার দেবানন্দ বসু বলেন, সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তার কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৩৫ শতাংশ, এখানে মোট ভোটার ১৯৯২ জন। নারী ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের দক্ষিণ হালিশহ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে মহিলাদের চারটি কেন্দ্র রয়েছে। সেখানকার ১ নং কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সুলতান মাহমুদ বেলা ১২টার দিকে নয়া দিগন্তকে বলেন, ৩৬৬৭ জন ভোটারের মধ্যে সাতটি বুথে ৬৪২টি ভোট পড়ে। ৩ নং কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোবারক হোসেন জানান, ৪২৬২ ভোটের মধ্যে বেলা ১২টা পর্যন্ত ৬২৯টি ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশ ভোটারই চাকরির সুবাধে সেখানে বসবাস করেন। ফলে এলাকায় তাদের খুব একটা পরিচিতি নেই। ফলে সেখানে আসা অনেক নারী ভোটারকে কোনো কেন্দ্রে ভোট সেটা নির্ধারণ করতে এনআইডি নিয়ে এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে ঘুরতে দেখা গেছে। সেখানে এনআইডি নিয়ে ভোট দিতে আসা মায়া বেগম, নীলা আকতার ও আসমা আকতার ভোট কোথায় দেবেন সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না বলে এ প্রতিবেদককে জানান। পার্শ্ববর্তী কাটাখালি স্কুলের ভোটারদের থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের এখলাসুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরুষ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আলোক চক্রবর্তী বেলা সোয়া ২টা পর্যন্ত ১৪৪৩টি অর্থাৎ ৪৬% ভোট পড়ার তথ্য জানান। এ ছাড়া নারী ভোটকেন্দ্রের ২৪৮০ ভোটারের মধ্যে বেলা পৌনে ২টা পর্যন্ত ৭০০ ভোট, অর্থাৎ ২৭% ভোট পড়ার তথ্য জানান প্রিজাইডিং অফিসার এনামুল হক।
চট্টগ্রাম-৯ আসনের কাপাসগোলা সরকারি প্রাথমিক বালক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ৩২১০ পুরুষ ভোটারের মধ্যে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত ৪২% অর্থাৎ ১৩৬০টি ভোট পড়েছে বলে জানান প্রিজাইডিং অফিসার বেলাল উদ্দিন।
কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ২৮৬৪ পুরুষ ভোটারের মধ্যে বেলা পৌনে ১টা পর্যন্ত ৩২% অর্থাৎ ৯২৭টি ভোট পড়ার তথ্য জানান প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ ইউনুস।
একই আসনের চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার হিল্লোল বিশ্বাস জানিয়েছেন বেলা ৩টা পর্যন্ত ৪৪৪২ ভোটের মধ্যে ৪৩% অর্থাৎ ২০০৬টি ভোট পড়েছে। একেবারেই শান্তিপূর্ণ ভোট হওয়ার কথা তিনি জানান।
কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মো: কবির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ৫০৮৮ জন ভোটারের মধ্যে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত ৪২.৫৫% ভোটার অর্থাৎ ২১৫ জন ভোট দিয়েছেন।
ডা: খাস্তসীর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৩৩ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রিজাইডিং অফিসার মুহিবুল্লাহ।
কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে ভোটারের মৃত্যু
এ দিকে চট্টগ্রাম নগরীতে ভোট দিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে এক বৃদ্ধ ভোটারের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে কোতোয়ালী থানাধীন কাজীর দেউড়ি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম মনু মিয়া (৫৫)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরের দিকেই ভোটাধিকার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রে উপস্থিত হন মনু মিয়া। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে স্বজনরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হলে ন্যাশনাল হাসপাতালে নেয়া হয়। তবে কর্তব্যরত চিকিৎসক সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।



