বিশেষ সংবাদদাতা
মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ইউরোপে লোক (আদম) পাঠানোর টার্গেট নিয়ে নতুন নতুন রুট ব্যবহার করছে। ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়ার সাগরপথে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠানোর হিড়িক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চক্রের সদস্যরা এখন ঢাকা থেকে সুদান এরপর মিসর নিচ্ছে। তারপর সুযোগ মতো ইউরোপের দেশগুলোতে নিরাপদে মানবপাচার করছে। আর এই চক্রের সাথে কোনো কোনো দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সখ্যতা থাকার অভিযোগ রয়েছে।
যদিও নতুন রুটে ইউরোপ পাড়ি দেয়ার আশায় অনেক বাংলাদেশী যুবক দালাল চক্রের হাতে লাখ লাখ টাকা দিয়ে মিসরে যাওয়ার ভাগ্য হচ্ছে। এরপর তাদের অনেকেরই স্বপ্ন আটকে যাচ্ছে। এর আগে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা রোমানিয়া, হাঙ্গেরী হয়ে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠানোর লক্ষ্য প্রথমে ওমরা ভিসায় সৌদি আরবের জেদ্দায় নিতো। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এখন তারা বিকল্প রুট হিসেবে সুদান মিসর রুট ব্যবহার করছে বলে জনশক্তি ব্যবসায়ী ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি ইউরোপের উদ্দেশ্য পাড়ি জমানো এক যুবক দেশে ািফরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোয়েন্দা সংস্থা ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের কাছে অকপটে স্বীকার করেন, ‘তিনি ইতালি যাওয়ার জন্য দালালের কাছে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী দালাল তাকে মিসরে নিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে ইতালিতে পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারেনি। একপর্যায়ে দালাল সাথে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে উপায় না পেয়ে তিনি চার-পাঁচ মাস মিসরে থেকে দেশে ফিরে আসেন।’
গতকাল ঢাকার নয়াপল্টন এলাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নিজের পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে নয়া দিগন্তকে বলেন, এই মুহূর্তে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ইউরোপের শ্রমবাজার নষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা লিবিয়া দিয়ে সাগরপথে ইউরোপের দেশগুলোতে পাঠাতো। এখন ওই প্রভাবশালী মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ঢাকা থেকে সুদানে নিচ্ছে। সেখান থেকে পাসপোর্টে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই মিসরে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর সেখান থেকে চুক্তি করে ইউরোপের দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। তবে এখন এই রুটও কঠিন হওয়ায় অনেক বাংলাদেশী তরুণ প্রতারিত হচ্ছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মিসরে আওয়ামী দুষ্ট চক্রগুলো বসে মিসরের শ্রমবাজার তো নষ্ট করছেই। এখন তারা নতুন করে সুদান হয়ে মিসর এরপর ইউরোপে পাঠানোর নতুন রুট তৈরি করেছে। মিসরে মানবপাচারকারী চক্রের সাথে যে কয়জন চিহ্ণিত মুখোশধারী আদম ব্যাপারী রয়েছে তাদের সাথে মিসরের বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাথে সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই মানবপাচারকারী চক্রের সাথে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। তার প্রশ্ন এখন এই আওয়ামী ফ্যাসিস্ট নামধারীদের কারা ধরবে ?
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে বৈধপথে রোমানিয়ায় লোক পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সেই লক্ষ্য ঢাকার কাকরাইলের বিএমইটিতে রোমানিয়ার ভিসা সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছিল। কিন্তু মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা কৌশলে রোমানিয়ার ভিসা সার্ভিস সেন্টারের বিরুদ্ধে কৌশলে অপবাদ দিয়ে তাদের এদেশে থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছিল। এরপর থেকেই রোমানিয়াগামী বাংলাদেশী কর্মীদের ভিসার ইন্টারভিউ দিতে ভারতে যেতে হয়। বাংলাদেশে রোমানিয়ার দূতাবাস নেই। এখন ভারতে যেতে ভিসা পাওয়া যায় না। ফলে রোমানিয়ার শ্রমবাজার অনেকটা হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সুযোগে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা রোমানিয়া সীমান্ত দিয়ে হাঙ্গেরি হয়ে ইতালি পাঠানোর রুট চালু করে। তার আগে তারা যাত্রীকে সৌদি আরবে ওমরা ভিসা দিয়ে পাঠায়। ওমরা শেষে সৌদি আরব থেকে তাদের রোমানিয়ায় নেয়ার ব্যবস্থা করে মানবপাচারকারী চক্র।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন দালালদের প্রলোভনে পড়ে যেসব তরুণ অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছে তাদের ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই কঠোর নজরদারি করতে পারলে অনেক তরুণের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এ ব্যাপারে তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বডি কন্ট্রাক্টে লোক যাওয়ার ওপর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বাড়তি নজরদারি শুরু করেছে বলে জানা গেছে। যদিও ইমিগ্রেশনে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের বেশির ভাগ ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া বলে সূত্র জানিয়েছে। তাদের কার্যকলাপও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি বলে অভিবাসন বিশ্লেষক ও ভুক্তভোগীরা মনে করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিমানবন্দরের পাশেই হাজী ক্যাম্পসহ আশপাশের হোটেলগুলোতে যেসব বিদেশগামী স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই অবৈধপথে বিদেশ যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকেন।



