ডিএসইর লেনদেন বাড়লেও কমেছে বাজার মূলধন

ডেল্টা লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়মের অভিযোগ বিএসইসির

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের মিশ্র আচরণেই গত সপ্তাহ কেটেছে পুঁজিবাজারের। সপ্তাহটিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ও বিশেষায়িত সূচকের একটির সামান্য উন্নতি ঘটলেও অবনতি ঘটেছে বিশেষায়িত অপর সূচকটির। এরই ফলশ্রুতিতে এ সময় বাজারে লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও হ্রাস পেয়েছে বাজার মূলধন। সপ্তাহের ৫টি কর্মদিবসের মধ্যে ৩টিতেই সূচকের কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয় বাজারটি। তবে বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ অবনতির শিকার হয়। বড় মূলধনের কোম্পানি নিয়ে গড়া এ সূচকের অবনতির ফলে হ্রাস পায় মূলধন।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের সপ্তাহের বড় পতনের পর ফেলে আসা সপ্তাহটিতে বাজারটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস ছিল, যা সামনের দিনগুলোর জন্য ইতিবাচক। এ সময় বাজারটিতে লেনদেনের উন্নতিই প্রমাণ করে বিনিয়োগকারীরা বাজারের সাথেই আছেন। সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাজারে সাময়িক বিক্রয়চাপ তৈরি হলেও পরবর্তীতে আবার স্বাভাবিক আচরণে ফিরবে বাজার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ১১ দশমিক ১২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। ৫ হাজার ২৩৪ দশমিক ১০ পয়েন্ট থেকে রোববার সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে স্থির হয় ৫ হাজার ২৪৫ দশমিক ২২ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি ৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও ডিএসই-৩০ সূচকটির অবনতি রেকর্ড করা হয় ১৯ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট। ব্যাংকসহ বড় মূলধনের বেশ কয়েকটি কোম্পানির দরপতনের ফলেই সূচকটির এ অবনতি। আর এরই প্রভাব পড়েছে ডিএসইর বাজার মূলধনে। গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন হ্রাস পেয়েছে ২ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা ডিএসইর বাজার মূলধন সপ্তাহান্তে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকায়।

গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল ৪ হাজার ৩৯৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির লেনদেন ছিল ৪ হাজার ১৫১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। সে হিসাবে সপ্তাহটিতে বাজারটির গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৮৭৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৮৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এ দিকে শেয়ারবাজারে বীমা খাতে তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন ঘিরে একাধিক গুরুতর অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং নিরীক্ষা গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়ম যথাযথভাবে আর্থিক প্রতিবেদনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এম জে আবেদিন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের এনগেজমেন্ট পার্টনার কামরুল আবেদিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) কাছে অনুরোধ জানিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ডেল্টা লাইফের ২০১৬ থেকে ২০২০ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবের ওপর পরিচালিত বিশেষ নিরীক্ষায় বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতি উঠে আসে। তবে সে সময় কোম্পানিটির নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাব অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষক কামরুল আবেদিন এসব অসঙ্গতি যথাযথভাবে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে উপস্থাপন করতে পারেননি।

বিশেষ নিরীক্ষায় দেখা গেছে, অনিষ্পন্ন বীমা দাবির বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি না রেখে কোম্পানিটি মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) প্রকৃত অবস্থার চেয়ে বেশি দেখিয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল মূল্যায়নের উদ্বৃত্ত অর্থ স্থিতিপত্রের ইকুইটি অংশে অন্তর্ভুক্ত না করায় কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, ডেল্টা লাইফ ১২৪ কোটি ২ লাখ টাকার অনিষ্পন্ন বীমা দাবির বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করেনি। ফলে কোম্পানির মুনাফা ও ইপিএস অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। একই সাথে ৬ কোটি ৫১ লাখ টাকায় ৩০টি গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কোম্পানির নিজস্ব ক্রয়নীতিও অনুসরণ করা হয়নি। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম হিসেবে ২৫৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকার অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল উদ্বৃত্ত স্থিতিপত্রের ইকুইটি অংশে দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ নিরীক্ষায় আরো উঠে এসেছে, কোম্পানির মোট ইস্যুকৃত শেয়ারের ২২.৭৭ শতাংশ একই পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিষয়টি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিএসইসি বলছে, পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ ছাড়াই কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ‘আন মডিফায়েড ওপেনিয়ন’ বা অপরিবর্তিত মতামত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান আর্থিক প্রতিবেদনে বড় কোনো অসঙ্গতি নেই বলে মত দিলেও পরবর্তী বিশেষ নিরীক্ষায় একাধিক গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি বিএসইসির কমিশন সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় বিশেষ নিরীক্ষায় উদ্ঘাটিত লঙ্ঘনগুলো নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত না হওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এফআরসিতে বিষয়টি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কমিশনের মতে, নিরীক্ষকের এই ব্যর্থতার কারণে বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষ তালিকাভুক্ত এই জীবন বীমা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ঘটনা শুধু একটি বীমা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি; বরং দেশের করপোরেট নিরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেই বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেখানে নিরীক্ষকদের গাফিলতি পুরো শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।