করালিনী

Printed Edition
করালিনী
করালিনী

মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী

সারা দিনের ক্লান্ত সূর্যটা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। আকাশে বিষণœতার রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম রেল স্টেশনের একপাশে বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বারি সাহেব। মনে হচ্ছে খুব টেনশনে আছেন। এই সমস্যা তার ছোটকালের। সামান্যতেই অস্থির হয়ে যাওয়া। টেনশন করা। এই মাত্র ঘোষণা হলো- সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেন কিছুক্ষণের মধ্যে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবে। ঘোষণা শুনেই বারি সাহেবের ছটফটানি বেড়ে গেল। বারবার প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাচ্ছেন। তার পাশ দিয়ে টিটিই যেতেই ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই, এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওটা না?’ টিটিই মাথা নেড়ে পান চিবাতে চিবাতে চলে গেলেন। ট্রেন হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে এসে থামল। দলে দলে মানুষ ট্রেনের উদরে ঢুকে যাচ্ছে। সবাই নিজেদের আসন খোঁজায় ব্যস্ত। বারি সাহেবের আসন ‘গ’ বগিতে। ২৭ নম্বর। জানালার ধারে। তিনি হাতের ছোট ব্যাগটা বাঙ্কের ওপর রাখলেন। স্বস্তিতে নিজের আসনে বসলেন। তার অস্থিরতা কমে গেল। বাসায় ফোন করলেন। হাতের পত্রিকাটি টেবিলে মেলে ধরতেই চোখ পড়ল তার সামনের আসনে বসা এক মহিলার দিকে। বারি সাহেবের দৃষ্টি আটকে গেল। সবই তো মিলে যাচ্ছে! সারাক্ষণ মুখে লেগে থাকা মৃদু হাসি। পানপাতার মতো মুখ। আধা জলে আধা ভাসা পদ্মের মতো দু’টি চোখ। সদ্য ফোটা সরিষা ফুলের মতো গায়ের রঙ। সবই একে একে মিলে যাচ্ছে। বারি সাহেব চোরা চোখে কয়েকবার তাকালেন। মহিলার দুপাশে দুই নাতনি বসা। তাদের চেহারায়ও মহিলার আদল আসে। মনে হয় কোনো ভার্সিটিতে পড়ে। বারি সাহেব কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। আবার ভাবলেন, সে লিপি না হয়ে পারেই না। কত সুন্দরী মেয়ে ছিল লিপি! বয়স তাকেও ক্ষমা করেনি। মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। বেখেয়ালে চামড়ার ভাঁজে পানের পিক নেমে এসেছে। বয়স যে হয়েছে, মাথার চুল তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। তারপরও সব কিছু মিলে পরিণত সুন্দর। কাব্য করার মতো। পুরাতন জমিদার বাড়ি দেখলেই যেমন বোঝা যায়- এখানে একসময় জমিদাররা থাকতেন। আসলেই চাঁদ কখনো বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয় না। লাবণ্য হারায় না। শান্ত পুকুরের একপাড়ে ঢেউ উঠলে, অন্যপাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে। বারি সাহেবের কৌতূহলী আচরণ সামনের আসনের মহিলাকেও কৌতূহলী করে তুলেছে। তিনিও আড়চোখে কয়েকবার তাকিয়েছেন বারি সাহেবের দিকে। এবার বারি সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি লিপি? তিনি সেই পরিচিত হাসি দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, তুমি বারি না?

‘হ্যাঁ’। ‘আমার চেহারায় কি অনেক পরিবর্তন?’

‘না’। ‘তাহলে আমাকে চিনতে তোমার এতক্ষণ লাগল কেন? আমি তো তোমাকে দেখেই চিনে ফেলেছি। তুমি অবশ্য অনেকটা আগের মতোই আছ। বয়স তোমাকে ক্ষমার চোখেই দেখেছে। এখন বলো, কোথায় আছ। কেমন আছ।’ দুজনেই গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন। কত দিন পর তাদের দেখা! ফেলে আসা দিনগুলো একে একে মনে ভিড় করছে। বানের জলের মতো নানা স্মৃতি মনে ভিড়ছে। তাদের কথায়, আচরণে তারুণ্যের চপলতা ফিরে এসেছে। মুখে কথার খই। একে-অপরের সাথে কথা বলে অনেকের খোঁজখবর নিলেন। তাদের উপচেপড়া উচ্ছ্বাস দেখে লিপির পাশে বসা দুই নাতনী খুব মজা পাচ্ছে। তাদের একজন বারি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি পুলিশে চাকরি করেন? মৃদু হেসে বারি সাহেব বললেন, তুমি বুঝলে কেমন করে? তবে আমি অবসরে গেছি আরো সাত বছর আগে। আমি পুলিশেই চাকরি করতাম। লিপি বললেন, পরিচয় করিয়ে দিতে ভুলেই গেছি। ওরা আমার নাতনি। আমার বড় ছেলের মেয়ে। দুজনই চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে পড়ে। একজনের নাম ময়না, আরেক জনের শালিক। আর বারি সাহেবের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন- ও আমার ফ্রেন্ড। আমরা একসাথে কলেজে পড়তাম। ‘ওদের দেখেই বুঝতে পেরেছি- তোমার নাতনি।’ ‘আমরা কত বছর আগে কলেজে পড়েছি?’

‘৪৫ বছর’। ‘এত বছর! বলেই বিস্মিত হয়ে গেলেন লিপি। বললেন, সময় চলে যায়। জীবন একটি বরফের টুকরার মতো। গলে গলে একদিন শেষ হয়ে যায়!’

‘মূলত জীবনের শেষ নেই। মৃত্যু মানে আরেক জীবনের শুরু।’ তাদের আলাপের মাঝে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন শালিক, আপনি কি গোয়েন্দা ছিলেন?

বারি সাহেব লিপির দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নাতনি অনেক বুদ্ধিমতী। এবার শালিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কেন মনে হলো আমি গোয়েন্দা ছিলাম?

‘আমি গোয়েন্দার ওপর অনেক বই পড়েছি। আপনাকে দেখে গোয়েন্দার বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছিল।’ ‘তুমি ঠিকই বলেছ। আমি টানা ৯ বছর ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইয়ে কাজ করেছি। তোমার মনে হয় গোয়েন্দাগিরির ওপর অনেক আগ্রহ। কাজটি অনেক কষ্টের। তবে অনেক মজাও আছে। কোনো রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলে অনেক মজা লাগে।’ ‘আপনার চাকরি জীবনে এমন কোনো ঘটনা আছে, যেটি মনে হলে ভালোলাগায় মনটা ভরে ওঠে?

তাদের আলাপের গতিকে অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে দিলো শালিক। ‘হ্যাঁ, আমার কর্মস্থল তখন ছিল চট্টগ্রাম। পিবিআই ইউনিটে আমার অনেক নামডাক ছিল। যেকোনো জটিল অপারেশনের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হতো। আমি কাজটি খুব উপভোগ করতাম। তোমার মতো আমারও গোয়েন্দাগিরির ওপর দুর্বলতা ছিল। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করতাম। যতক্ষণ পর্যন্ত রহস্য উদঘাটন করতে না পারতাম, আমার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হতো। চট্টগ্রামে এক খুনের মামলার রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব আমার হাতে আসে। একই কায়দায় ষাটোর্ধ্ব মহিলা খুন হচ্ছে। বেশ কয়েকটি খুন হয়েছে। খুনিকে ধরা যায়নি। বিরাট রহস্য। খুনের আগে নিহত ব্যক্তিকে আপ্যায়ন করা হয়। তারপর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এ দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার মধ্যে এক ছটফটানি কাজ করে। আমি এমনিতেও একটু অস্থির প্রকৃতির মানুষ। কী করে এই খুনিকে ধরব ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, একটি ধারালো চাকু দিয়ে আপেল কাটা হয়েছে। মাল্টা কাটা হয়েছে। ডালিম কাটা হয়েছে। কাটার ধরন দেখে মনে হয় কোনো মেয়ে মানুষ এগুলো কেটেছে। হঠাৎ চোখে পড়ল চাকুর গায়ে রক্ত। মনে হলো এগুলো খুনির রক্ত। ফল কাটতে গিয়ে অস্থিরতায় হাত কেটে ফেলেছে। আমার মনে হলো অঙ্কের সমাধান আমি পেয়ে গেছি। খুব যতনে আমি আলামতগুলো হাতে নিলাম। চাকুতে পাওয়া সেই রক্তের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠালাম। পরীক্ষার পর ওই রক্তের নমুনা মিলে যায় সেই সময়ের বিখ্যাত এক গায়িকার সাথে। আমি অবাক হয়ে যাই। যে হাতে বাঁশি মানায় সে হাতে খুনও মানায়! জগতে এমন অনেক কিছু ঘটে, যা আমাদের কল্পনাতেও আসে না। আমি আমার বসের সাথে বিষয়টি শেয়ার করলাম। তিনি বললেন, তাকে গ্রেফতার করো। তাকে গ্রেফতার করলাম। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। কিন্তু অপরাধী তার অপরাধের কথা জানে। তার মধ্যে কোনো ভণিতা দেখলাম না। স্বাভাবিক। বিনা ওজরে আমাদের সাথে চলে এলো। আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে খুনের কথা স্বীকার করেন তিনি। মনে হয়, এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। খুনের দায় স্বীকার করে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকেন। অবলীলায় বলতে থাকেন তার অতীত। খুব ছোট্টকালে তার বাবা মারা যান। তার মার কাছে বড় হন তিনি। তার মা ছিলেন নেশাগ্রস্ত। নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য তাকে অন্য পুরুষের হাতে তুলে দিতেন। পুরুষরা তাকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খেত। তার খুব কষ্ট হতো। নিজের রক্তাক্ত শরীর মাকে দেখিয়েও তার মন গলাতে পারতেন না। যে করেই হোক তার নেশার টাকা চাই। ১৩ বছর বয়সে একবার গর্ভবতী হয়ে গিয়েছিল। তার মা তার গর্ভপাত ঘটায়। খুব কষ্ট হয় তার। কথা বলতে বলতে কান্নার আওয়াজ আরো বেড়ে যায়। দুই চোখে শ্রাবণের ধারা। জড়ানো কণ্ঠে বললেন, আমি আর পারছিলাম না। কিন্তু কোথায় যাবো? কী করব? মায়ের কোল যার জন্য নিরাপদ নয়, তার নিরাপত্তা কোথায়? মানুষে আমার বড় ভয়। পুরুষ মানুষ দেখলে আঁতকে উঠি আমি। মানুষের প্রতি তৈরি হয় প্রচণ্ড ঘৃণা। একদিন সুযোগ বুঝে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। আমাদের বাড়ির সামনে ছিল অন্তহীন ফসলের মাঠ। মাঠ পেরোলেই হাইওয়ে। এই মাঠ দৌড়ে পাড়ি দেই আমি। হাইওয়ের পাশে একটি জামগাছের নিচে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলাম। আমার মুখে কান্নার দাগ। আমার সামনে দিয়ে এক ফর্সা মহিলা রিকশা করে যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে তিনি রিকশা থেকে নেমে আসেন। আমার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করেন। আমি কোনো কথা বলি না। আমাকে তার বাসায় যেতে বলেন। আমি ভয় পাই। যেতে চাই না। কিন্তু রাস্তাতেইবা নিরাপত্তা কোথায়? তাছাড়া তার মা দেখতে পেলে তাকে আবার সেই নরকে ঢুকাবে। মনে মনে ভাবলাম, শেকড় যখন একবার উপড়ে ফেলেছি, আর ভয় কিসের। মহিলার বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নিলাম। মহিলা ছিলেন চাকরিজীবী। তার বাসায় আমি অমানবিক খাটুনি খাটতাম তিন বেলা ভাতের জন্য। তিনি কোনো দিন ভালোভাবে একটি কথাও বলেননি আমার সাথে। তবুও সব সহ্য করেছি। এদিকে আমার মা আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। তার আদরের মেয়ে, নাড়িছেঁড়া ধন হারিয়ে গেছে! আমি ছিলাম তার টাকা। তার নেশা। আমি আর কোনো দিন তার কাছে ফিরে যাইনি। তার কথা মনে হলে মাথায় খুন চড়ে যেত। তার বয়সী মহিলা দেখলে আমি স্থির থাকতে পারতাম না। খুন না করা পর্যন্ত আমার অস্থিরতা কমত না। এরপর থেকে খুন করাটা এক ভয়াবহ নেশায় পরিণত হলো। খুন না করে আমার উপায় ছিল না। সবাই গল্পের মধ্যে ঢুকে গেছে। এটা তো গল্প নয়। বারি সাহেবের জীবন থেকে নেয়া ঘটনা। লিপি একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। হায় আল্লাহ! তারা ঢাকা চলে এসেছে। সময় কত দ্রুত চলে যায়!