কাজী জহিরুল ইসলাম
ভেঙে পড়া এক দুপুরে
ভেঙে পড়া দুপুরের টুকরোগুলো যখন মার্বেলের মতো গড়াচ্ছিল বুলনোজ স্টোনের
ওপর তখন ওদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল চারজন বৃষ্টি।
নুয়ে পড়া যৌবনের বারান্দায় আমি;
যে টুকরোগুলো অনিচ্ছাকৃত লাফিয়ে ওঠে,
কাচ ঠেলে আসুক না ওরা,
উষ্ণ করে তুলুক পড়ন্ত শীত।
বৃষ্টি-বালকদের দুরন্ত স্প্রিঙ্কলার ঠেলে রোদের বিস্রস্ত খণ্ডগুলো সারা বিকেল নিস্তেজ পড়ে রইল
ধীরপ্রবণ বসন্ত-বিছানায়, ঋতুচক্রের ধুলোয়।
এক কাপ ধূমায়িত কফির গরম পেয়ালা দু’হাতে চেপে বসে আছি নিরাপত্তার কুশনে;
আবিসিনিয়া হাসছে খুব,
ছলকে ছলকে ওঠে আকেকি নদীর বিস্মৃত বিকেল
চারজন স্প্রিঙ্কলার বালকের সঙ্গে খুনসুটি করে
লুসি হাসে নেচে নেচে এস্কিস্তার প্রাচীন মুদ্রার তাল
বুনে দেয় সভ্যতার প্রবীণ বাগানে।
আবু এন এম ওয়াহিদ
মানুষের মন
মানুষের মনের ভেতরে
একটা খোলা মাঠ আছে-
সেখানে দুপুরবেলা গরু চরে না,
সন্ধ্যেবেলা কলসি কাঁখে মালতি ঘরে ফেরে না,
ভোরবেলা শিউলিতলায় ফুল ঝরে না,
তবুও কিছু একটা ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে!
একটা চওড়া জানালা আছে,
যা খুললে আলো আসে না,
শুধু পুরনো চিঠিগুলোর গন্ধ পাওয়া যায়,
যার অনেকটাই লেখা,
নামহীন এক কিশোরীর নামে।
মনের ভেতরে একটা নদী আছে,
যেটা কখনও শুকায় না, বয়ে চলে নিরন্তর।
তবে সেই নদীতে মাছ নেই-
শুধু স্মৃতির কাচের বোতল ভাসে,
যার ভেতরের পাতে কাঁচা হাতে লেখা,
‘ক্ষমা করো’, ‘ভুল হয়েছিল’,
‘তোমার অপেক্ষায়।’
কখনো কখনো হঠাৎ ঝড় ওঠে
মনের মাঠের ঘাটে ঘাটে,
তখন মানুষ বলে,
‘আমি ঠিক আছি, চিন্তা করো না!’
তুমি যদি ভালো করে দেখো,
তার চোখের ভেতরে তখন
একটা ছোট ছেলে কাঁদছে,
মাটির পুতুল ভেঙে গেছে বলে।
এই মন, একটা অপাঠ্য বই,
একটা শব্দহীন গান,
একটা দরজাবিহীন ঘর,
যে ঘরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে
কেউ ঢুকতে পারে না,
তথাপি এই মন বলে,
সেই গোপন ঘরে কেউ বসে আছে,
চোখ বুঁজে, তোমার নাম উচ্চারণ করে’
নয়ন আহমেদ
জুলাই
এক বিকেলের বিক্ষোভ যখন বারুদ হয়ে উঠল
একজন একজন করে যখন সমুদ্রের গর্জন হলো
লাখ লাখ জনতা যখন ঐক্যবদ্ধ আগুনের ফুলকি হলো
যখন প্রমিথিউসরা সভ্যতার হৃদয় ছুঁয়ে লাল গোলাপের জন্য ছুটে চলল
আলো যখন অন্ধকার সরাতে সরাতে সামনে চলল
যখন বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়ে কেঁপে উঠল সমস্ত দেশ
তখনই মৃত্যুও রক্তজবা হয়ে ফুটে রইল থোকা থোকা
আঠারো হাজার মুগ্ধ রক্তজবা
আঠারো হাজার আবু সাঈদ গোলাপের চেয়ে সুন্দর
আঠারো হাজার আহাদ শাদা শাপলা
আঠারো হাজার নাঈমা সূর্য ওঠা ভোর
আঠারো হাজার সামির থোকা থোকা জুঁই
ঠিক তখনই আমরা আঠারো কোটি উষা ও রোদের কারিগর
আমরা জুলাইয়ের হৃৎপিণ্ডে আঁকি পঞ্চাশ হাজার বর্ণমালার মহাকাব্য
একজন সাদিক কায়েমের সাদৃশ্যে জেগে উঠছে ধান রোপণ করা সকাল
আমরা দেখি বাঘের মতো গর্জন করে উঠছে হাসনাত আব্দুল্লাহ
আসিফের ভেতর উঁকি দিচ্ছে নাম-না-জানা অলৌকিক উচ্ছ্বাস
উত্তাল ঢেউয়ের সমান নাহিদের দীর্ঘলাফ
আর বাকেরের মতো তরুণেরা আগুনের ব্যঞ্জন
ছড়াতে ছড়াতে বিদ্রোহের বীজ রুইয়ে দিচ্ছে
হান্নান মাসুদেরা কাঁধে বহন করছে আলো সম্প্রদায়।
রাফিরা কৃষকের মতো চাষ করতে করতে সবুজ ধানের উৎসব হচ্ছে
কালবৈশাখীর মতো এগিয়ে আসছে সারজিসের মতো অগণিত সূর্যোদয়
বাঘিনীর মতো শত্রুহননে এগিয়ে আসছে এ মাটির কন্যারা
জুলাই হয়ে উঠছে লাল ফুলের বিশাল বাগান
এখনই নতুন দিনের জন্ম হবে
আঠারো কোটি গোলাপের মতো ।
মামুন সুলতান
বিপ্লবের পদধ্বনি
কার যেন পদধ্বনি শোনা যায়
ঈসা খাঁর মতো অশোকলিপি ভেদ কর
দস্তার কঠিন দেহে নূহের প্লাবন
ঘোড়ার গতিতে আকাশের গাম্ভীর্য থেকে
ধেয়ে আসছে কান পাত শুনো আসছে
বিরান ভূমিতে কারা যেন হাল-জোয়াল নিয়ে
নতুন চাষাবাদে ধানের নতুন বীজ নিয়ে আসছে
নতুন ধানে প্রাণ ফিরে আসছে
বদর থেকে নদীয়া
বাঁশের কেল্লা থেকে মতিহার
একাত্তর থেকে চব্বিশ প্রান্তর থেকে প্রান্তর মাড়িয়ে যুগ যুগান্তরের অশ্বধ্বনি শুনতে কি পাও?
বেদনাবিধুর এই অসুস্থ নগরে
পাহাড় সমান ভালোবাসা নিয়ে নিরাময় ফিরে আসছে বিধ্বস্ত বিক্ষত এই গাঁয়ে
সবুজ ঘাসের মতো সজীব সকাল ফিরে আসছে
মঙ্গাপীড়িত এই আকালের দেশে
শস্য-সোনালি অফুরান ফসল ফিরে আসছে
দুর্ভিক্ষ-দুর্দিন দুরাশার বুকে
আশায় বুক বাঁধার দিন ফিরে আসছে।
নগ্ন-অশালীন নিলাজ ভূমিতে
পুষ্পিত পাতাবাহার অগণন বাগান ফিরে আসছে
মাতাল উন্মাদের দেশে
ধীমান ধ্যানী পুরুষ ফিরে আসছে
আসো হে বীরত্ব তোমার পৌরুষ নিয়ে আসো
প্রেমে-আমত্ত বীর মেধাপোক্ত বিবেক নিয়ে আসো
উত্তাল ঢেউয়ের মতো বিপ্লব নিয়ে আসো
মানুষের ঘরে ঘরে জ্বালিয়ে দাও বিপ্লবের বাতি
তোমার জন্য প্রতীক্ষা
তোমার জন্য প্রতীক্ষা
হাজার বছর ধরে দেখি না তোমায়
এই জমিনে তোমার পদধ্বনি শুনতে চাই।



