মুহা: জিললুর রহমান সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরার চারটি আসন নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও ভোটের মাঠে তাদের প্রভাব রয়েছে। আওয়ামী লীগের সংখ্যালঘু ভোটাররা হেলে যেতে পারে জামায়াতের দিকে। এমন মন্তব্য করছেন অনেক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের তিনটিতে জামায়াতের প্রার্থীদের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি প্রার্থীদের। অপর একটি (সাতক্ষীরা-৩) আসনে জামায়াতের সাথে লড়াই হবে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ মো: ইজ্জত উল্লাহ, জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো: রেজাউল করিম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো: ইয়ারুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে প্রধান লড়াই হবে বিএনপি প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মো: ইজ্জত উল্লাহর সাথে। বিএনপি প্রার্থী হাবিব দীর্ঘ সময় কারাবন্দী ছিলেন। বিগত ৫ আগস্টের পর তিনি মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফিরেছেন। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। অপর দিকে দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন জামায়াত প্রার্থী ইজ্জত উল্লাহ। ফলে তিনি শুরু থেকেই প্রচারের বাড়তি সুযোগ পেয়েছেন।
এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৩ জন এবং পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৩ জন। এ ছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন দু’জন।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এবং বিএনপির প্রার্থী আলিপুর ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান আলহাজ মো: আব্দুর রউফ। দু’জনই নিয়মিত গণসংযোগ ও প্রচারে সক্রিয় রয়েছেন। দেরিতে হলেও গণসংযোগ শুরু করেছেন জাতীয় পার্টি প্রার্থী সাবেক এমপি আশরাফুজ্জামান আশু।
এ আসনে অতীতে জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেও বিএনপির কোনো প্রার্থী এখনো বিজয়ী হতে পারেননি। তবে এবার প্রথমবারের মতো দেবহাটা উপজেলাকে সদর আসনের সাথে যুক্ত করায় ভোটের হিসাব কিছুটা জটিল হয়ে উঠেছে। এখানে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে লড়াই হবে বলে ধারণা করা হলেও জনমত জরিপে জামায়াতের প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে আছে।
এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৫ জন এবং পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৫ জন। ট্রান্সজেন্ডার ভোটার রয়েছেন চারজন সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ‘গরিবের ডাক্তার’ খ্যাত ডা: শহিদুল আলম দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। এতে স্থানীয় বিএনপির ভেতরে বিভাজন দেখা দিয়েছে। দলীয় বিভক্তি এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে চাপে রয়েছে বিএনপি প্রার্থী সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীন। এ আসনে বিএনপির ভোট দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় সুবিধা কাজে লাগাতে পারে জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার।
অন্য দিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ডা: শহিদুল আলম দলীয় শৃঙ্খলা ভঙের অভিযোগে বহিষ্কৃত হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি দুই উপজেলাতেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। নিজ উপজেলা কালিগঞ্জে তার শক্ত অবস্থান থাকায় জয়লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার পক্ষে মাঠে রয়েছে দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃৃত একাধিক নেতাকর্মী।
স্থানীয় প্রভাব, জনপ্রিয়তা ও দলীয় প্রতীক-সব মিলিয়ে এখানে জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার, বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন এবং বিএনপির বিদ্রোহী বহিষ্কৃত নেতা ডা: শহিদুল আলমের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে এ আসনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিন্দু ভোট ও তরুণ ভোটাররা জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হতে পারেন।
এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ দুই হাজার ২২১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ ৪৮ হাজার ২৩৫ জন এবং পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৩ জন। ট্রান্সজেন্ডার ভোটার রয়েছেন তিনজন।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) সুন্দরবন-ঘেঁষা এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে বেশ বৈচিত্র্যময়। এখানে সব বড় দল থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জামায়াতের সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপির তরুণ প্রার্থী ড. মো: মনিরুজ্জামানের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শ্যামনগরকে নতুন করে আসন পুনর্বিন্যাস করায় ভোটের সমীকরণও নতুনভাবে তৈরি হয়েছে। তরুণ ভোটারদের কাছে ড. মনিরুজ্জামানের গ্রহণযোগ্যতা এবং গাজী নজরুল ইসলামের অভিজ্ঞতা- এই দুইয়ের সংঘাতে আসনটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৯৭ হাজার ৮৬৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার এক লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৪ জন এবং পুরুষ ভোটার এক লাখ ৪৯ হাজার ৯১৮ জন। ট্রান্সজেন্ডার ভোটার রয়েছেন চারজন।
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিতে এবার বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এবং বাকি একটিতে জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জেলার চারটি আসনে জামায়াত প্রচার-প্রচারণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত কারা জয়ী হবে, তা জানতে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সাতক্ষীরাবাসীকে।


