সীমান্তে সাপ কুমিরসহ হিংস্র প্রাণী ব্যবহারের হুমকি

বিজেপির বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা সম্পর্কে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব

Printed Edition

এস এম মিন্টু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা, সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধে সাপ ও কুমির ব্যবহারের মতো কঠোর পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি। এটা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিজেপি নেতারা পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ থেকে ‘অনুপ্রবেশ’ এবং ‘ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের’ অভিযোগ তুলে যে প্রচারণা চালাচ্ছে তা ঢাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। এটি দুই দেশের পারস্পরিক বন্ধুত্বের বার্তাকে দুর্বল করতে পারে। আজ বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লিতে ভারতের কয়েকজন মন্ত্রীর সাথে বৈঠকের কথা রয়েছে। এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উঠে আসবে। এরই মধ্যে বিজেপি নেতাদের বাংলাদেশবিরোধী প্রচার এবং সীমান্তে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হিংস্র জীবজন্তু ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাপ-কুমির বা প্রাণঘাতী জন্তু শুধু বাংলাদেশীদেরই ক্ষতি করবে না এর প্রভাব ওপারের বসবাসকারীদের ওপরও পড়বে। বিজিবি কর্মকর্তারা বলেন, আমরা সীমান্ত সবসময় সুরক্ষা দিয়ে আসছি। প্রতিবেশী দেশের চোরাচালানিরাই আমাদের দেশে পাচারের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এর আগেও মৌমাছির চাক দিয়ে সীমান্ত সুরক্ষার চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। কিন্তু সেই মৌমাছি বিএসএফ সদস্য এবং স্থানীয়দের কামড়েছে। তাই সীমান্ত সুরক্ষায় প্রয়োজন আধুনিকায়ন। সাপ-কুমির কি নাগরিকত্ব দেখে কামড় দেবে? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ সীমান্তই কেবল নয়, জীবন ও জনঘনিষ্ঠও। সীমান্তে ভারতীয় জনগোষ্ঠীও কম নয়; সাপ-কুমির যে তাদের কামড়াবে না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ সীমান্তের নদীপথ ও জলাভূমিতে বিষাক্ত প্রাণী ছাড়ার পরিকল্পনা করছে ভারত। দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সাপ ও কুমিরের মতো প্রাণী ছাড়তে চাচ্ছে সীমান্ত সুরক্ষার অংশ হিসেবেই। সীমান্তে এই বৃহৎ প্রতিবেশীর যে আগ্রাসী আচরণ আমরা দেখে আসছি, তাতে এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। তারা বলছেন, বিএসএফের মাধ্যমে নদী ও জলাভূমিতে সাপ ও কুমির ব্যবহারের যে সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে তা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের চলাচল ও সীমান্ত বাণিজ্যে মারাত্মক বিঘœ ঘটবে। এটি বাংলাদেশ সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও উত্তেজনা বাড়াবে। বিজেপি বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নতুন সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। যদিও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী মাঠের এই ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও নীতি (যেমন-এনআরসি বা সিএএ নিয়ে বিতর্ক) দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে বাংলাদেশকে ‘বোঘি-ম্যান’ (ভীতিকর বস্তু) হিসেবে উপস্থাপন করলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বিজেপি যে ‘বাংলাদেশ-বিরোধী’ বয়ান তৈরি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার হলেও সেই ব্যবস্থাপনার ধরন, পদ্ধতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিবেশী আস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, যার প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদী ও জলাভূমি দ্বারা গঠিত। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তোলে এবং উভয় দেশের জন্যই নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অবৈধ পারাপার একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পদ্ধতি যদি মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী হয়, তাহলে তা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। তিনি বলেন, কুমির ও সাপের মতো প্রাণী ব্যবহার করে বাংলাদেশ সীমান্তে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ তৈরির চিন্তাভাবনা ভারতের যদি বাস্তবে বিবেচনায় থেকেও থাকে তা একটি গভীর উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি-ড্রোন, সিসিটিভি, স্মার্ট ফেন্সিং এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রাণঘাতী জীবজন্তু ব্যবহার করার ধারণা মূলত ভয় ও আতঙ্ককে নীতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। এটি কার্যত একটি ‘ডিটারেন্স’ (ভীতি প্রদর্শন) কৌশল, যা মানবিক নিরাপত্তার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ভীতি সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়। এ ধরনের ধারণা কয়েকটি কারণে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

প্রথমত, এটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। সীমান্ত পারাপারের সাথে যুক্ত সব মানুষ অপরাধী নয়। অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, জীবিকা, পরিবারিক সংযোগ বা স্থানীয় বাস্তবতা মানুষকে সীমান্ত অতিক্রমে প্ররোচিত করে। সেখানে প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।

দ্বিতীয়ত, এটি প্রতিবেশী দেশের প্রতি অবিশ্বাস ও কঠোর মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর। সেই সম্পর্কের মধ্যে যদি এমন নীতি বা ভাবনা প্রবেশ করে, যা ‘মানবিক বিবেচনা’র পরিবর্তে ‘ভয়ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ’কে গুরুত্ব দেয়, তাহলে তা পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তৃতীয়ত, এটি কূটনৈতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দেয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি যৌথ দায়িত্ব, যেখানে দুই দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনে যৌথ টহল, তথ্য আদান-প্রদান, উন্নত অবকাঠামো এবং সীমান্তবর্তী জনগণের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। এর পরিবর্তে যদি একতরফাভাবে কঠোর ও অস্বাভাবিক পদক্ষেপের চিন্তা করা হয়, তা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তুলতে পারে।

চতুর্থত, পরিবেশগত ও নৈতিক প্রশ্নও এখানে জড়িত। কুমির বা সাপের মতো প্রাণীকে পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ছেড়ে দেয়া পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং উভয় দেশের সীমান্তবর্তী নিরীহ জনগণের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া এটি একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে গুলি করে হত্যা, কঠোর নজরদারি এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া অবস্থান-এসব বিষয় বাংলাদেশে জনমতের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদি এই ধরনের নতুন ধারণা যুক্ত হয়, তাহলে অনেকের কাছে এটি ভারতের একটি ‘কঠোর ও অমানবিক সীমান্ত নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।

মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা একটি বাস্তব প্রয়োজন এবং উভয় দেশই অবৈধ কার্যক্রম রোধে সচেষ্ট। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা অবশ্যই হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত, মানবিক এবং সহযোগিতামূলক। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইতোমধ্যে বহু ক্ষেত্রে সফল সহযোগিতার উদাহরণ রয়েছে- যেমন সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, ছিটমহল বিনিময় এবং নিরাপত্তা সংলাপ। এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, সীমান্তকে শুধু একটি নিরাপত্তা রেখা হিসেবে নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগের সেতু হিসেবে দেখা প্রয়োজন। ভয়, দমন বা অমানবিক কৌশল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, যৌথ উদ্যোগ এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই একটি টেকসই ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, এমন কোনো নীতি বা চিন্তাভাবনা, মানবিকতা ও আস্থার পরিপন্থিতা পুনর্বিবেচনা করা উভয় দেশের স্বার্থেই জরুরি। বাংলাদেশের কূটনীতিক পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং উদ্বেগ জানানো প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে সীমান্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় কিশোরী ফেলানীকে। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরীটির লাশ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। গত বছর বিএসএফের গুলিতে ৩২ বাংলাদেশী প্রাণ হারিয়েছে। সীমান্তের অধিকাংশ স্থানে বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়া আছে। এর বাইরে যেসব স্থানে নদী বা জলাশয় রয়েছে, এবার সেখানে বিষাক্ত সাপ, কুমিরের মতো সরীসৃপ প্রাণী ছাড়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করছে তারা।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত নভেম্বরে বিএসএফকে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও কারিগরি দিক থেকে এগিয়ে থাকা সীমান্তবাহিনী হিসেবে গড়তে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। তার পরই দেখা যাচ্ছে কুমির-সাপ ব্যবহারের চিন্তা করছে তারা। চিন্তা হিসেবে এটি অভিনব হতে পারে; কিন্তু এর মধ্যে প্রতিবেশীর প্রতি মনোভাবও স্পষ্ট।