হাইকোর্ট কর্মচারীর ঝুলন্ত লাশ হত্যা নাকি আত্মহত্যা?

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ কেন্দ্রবিন্দু সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে ‘বিজয় একাত্তর’ ভবন থেকে হাইকোর্টের এক কর্মচারীর রহস্যজনক ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল বিকেলে ভবনের অষ্টম তলার একটি টয়লেটের জানালার বাইরে থেকে মো: কামাল হোসেন (৪৭) নামে ওই কর্মচারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চের জামাদার (আদালত সহকারী) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তবে লাশের ঝুলন্ত ভঙ্গি, হাতের অবস্থান এবং ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে এটি ‘আত্মহত্যা’ নাকি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, কর্মচারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে গভীর ধোঁয়াশা ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সংবেদনশীলতা বিবেচনায় সাধারণ পুলিশের পাশাপাশি তদন্তে নেমেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক টিম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার দুপুরে বিজয় একাত্তর ভবনের অষ্টম তলার দক্ষিণ কোণের একটি টয়লেটের জানালার বাইরে এক ব্যক্তিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান কয়েকজন সাধারণ কর্মচারী। স্থানটি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ এবং সাধারণত টয়লেটে যাওয়া ছাড়া কারো নজরে পড়ে না। খবর পেয়ে শাহবাগ থানা পুলিশ এবং সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে নিহতের স্ত্রী ও মেয়ের উপস্থিতিতে লাশটি উদ্ধার করা হয়।

লাশের সুরতহাল ও উদ্ধারের সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে কামালের মৃত্যু নিয়ে তীব্র সন্দেহ দানা বেঁধেছে। তারা বলেছেন, নিহতের হাত জানালার গ্রিলের মধ্য দিয়ে বাইরের দিকে ঝুলে ছিল। সাধারণত কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করলে তার হাত গ্রিলের বাইরে এভাবে স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। ভবনের ওই কোণের কার্নিশ ও জানালার দূরত্বের কারণে লাশের পা প্রায় মাটি বা কার্নিশ ছোঁয়া অবস্থায় ছিল। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের মতো একটি জনাকীর্ণ ও সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত ভবনে আত্মহত্যার জন্য এমন একটি দুর্গম জানালার বাইরের অংশ বেছে নেয়া অস্বাভাবিক।

মৃত্যুর রহস্য নিয়ে নয়া দিগন্তের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এক কর্মচারী আত্মহত্যা করেছেন এমন প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। লাশের অবস্থান ও হাতের ভঙ্গি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তা ময়নাতদন্তের পরই কেবল পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। অনেক সময় পা মাটিতে লেগে থাকা অবস্থায় গলায় ফাঁস আটকে গেলেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, অতীতেও এমন নজির রয়েছে।

তিনি আরো জানান, সিআইডির ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহ করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ (অপমৃত্যু নাকি হত্যা মামলা) নেয়া হবে।

নিহত কামাল হোসেন পরিবার নিয়ে ঢাকার শ্যামলী এলাকায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা থানায়। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি কাটাতে তারা গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। রোববার ঢাকা ফেরেন। গতকাল সকালে অফিস খোলার প্রথম দিন তিনি শ্যামলীর বাসা থেকে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হন। স্ত্রী মনি নয়া দিগন্তকে এসব তথ্যা জানিয়েছেন।

স্ত্রী মনি এবং বেশ কয়েকজন সহকর্মী জানিয়েছেন, কামাল বেশ কিছুদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গতকাল অফিসের আসার সময় তাদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য হয়েছিল কিনা নয়া দিগন্তের এমন প্রশ্নে স্ত্রী মনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো মনমালিন্য বা পারিবারিক কলহ ছিল না। তিনি মানসিকভাবে কিছুটা সমস্যায় ভুগছিলেন ঠিকই, কিন্তু আজ (সোমবার) সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ওনাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কেন এমন হলো, আমি বুঝতে পারছি না।’ এ দম্পতির সংসারে দুইটি মেয়ে রয়েছে।