কুমিল্লা প্রতিনিধি ও চৌদ্দগ্রাম সংবাদদাতা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মো: তাহের এমপি। তিনি বলেছেন, ‘দেশে শিশু হত্যা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব ঘটনার সাথে সরকারি দলের লোকজন জড়িত বলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।’ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে এখনই ‘ব্যর্থ’ বলতে রাজি না হলেও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে মানুষের কাছে তাদের ব্যর্থতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তখন আমরা বলি বা না বলি, জনগণই তাদের ব্যর্থ সরকার হিসেবে মূল্যায়ন করবে; যা দেশের জন্য মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।’
রোববার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াত আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী ও গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। চৌদ্দগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতের আমির মাহফুজুর রহমান এবং সঞ্চালনা করেন সেক্রেটারি বেলাল হোসাইন।
ডা: তাহের আরো বলেন, ‘আমরা সংসদে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরব। পাশাপাশি সংসদের বাইরেও সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে কিভাবে আরো কার্যকর ও সচেতন ভূমিকা পালন করা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’ রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য তিনি বিএনপি এবং সরকারপ্রধানের প্রতি আহ্বান জানান।
ডা: তাহের বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আমাদের চেয়ে ১০ পার্সেন্ট ভোট বেশি পেলেও জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসন ও জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে। প্রধান বিরোধীদল মানেই আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবে। আমরা আশা করছি, আগামীতে জামায়াতে ইসলামীই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে।
নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডা: তাহের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালীন এ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসেছিলাম। নির্বাচন অতিবাহিত হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় এলাকার উন্নয়নে আরো ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ এনেছি। সবেমাত্র বর্তমান সরকারের তিন মাস অতিবাহিত হলো; যদি বিএনপি পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে যায়, তাহলে এই বরাদ্দ আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
চৌদ্দগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে নায়েবে আমির বলেন, ‘চৌদ্দগ্রামের মৌলিক সমস্যা কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবার। এই চৌদ্দগ্রামে এ দুটোর কোনো স্থান হবে না। কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের আমি ছয় মাস সময় দিলাম, আপনারা অন্য কোনো ভালো ব্যবসা খুঁজুন। এরপরও যদি এই রাস্তায় থাকেন, তবে বোঝা যাবে আপনারা ইচ্ছে করেই আছেন। সমাজে অপরাধীদের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি। এদের ধরার জন্য আপনারা ঘর থেকে বের হলে সমাজ থেকে অপরাধ কমে যাবে। আমার নেতৃত্বেই এবার কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হবে, কাউকে আর ছাড় দেয়া হবে না।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আমির অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহজাহান, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, জামায়াতের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা সাবেক আমির আবদুস সাত্তার এবং কুমিল্লা মহানগরী সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন- কুমিল্লা মেডিক্যাল সেন্টারের এমডি ডা: শফিকুর রহমান পাটোয়ারী, ইসলামিক চিন্তাবিদ ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সাবেক আমির সাহাব উদ্দিন, সাবেক সেক্রেটারি শাহ মো: মিজানুর রহমান, পৌরসভা আমির মাওলানা ইব্রাহীম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সভাপতি মাওলানা শাহজালাল ও এনসিপি কুমিল্লা অঞ্চলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান। এ ছাড়া চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা ও উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী এই ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
রিজভীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জুবায়েরের
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহ্যবাহী ও নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা এই দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ইয়ানত কোনো চাঁদাবাজি নয়, এটি পবিত্র আমানত। জামায়াতে ইসলামীর সব স্তরের জনশক্তি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে প্রতি মাসে সংগঠনের ফান্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা ‘ইয়ানত’ দান করে থাকেন। এটি কোনো জোর-জুলুমের বিষয় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং একটি কল্যাণকামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কর্মীদের পবিত্র আত্মত্যাগ। রিজভী সাহেব এ পবিত্র সাংগঠনিক নিয়মতান্ত্রিকতাকে ‘হাদিয়াবাজি’ বা ‘ইয়ানতবাজি’ বলে মূলত এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে চরমভাবে অপমান করেছেন।
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনো ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বা জোর করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে না। বিএনপির নেতাকর্মীদের মতো জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করা কিংবা পাথর দিয়ে আঘাত করে নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার কোনো ইতিহাস জামায়াতের নেই। এ ধরনের অপকর্ম ও সন্ত্রাসী সংস্কৃতির ধারক-বাহক কারা, তা এ দেশের জনগণ ভালো করেই জানে।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি সুশৃঙ্খল দল। কোনো স্তরের কর্মীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে দল তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে এবং সাথে সাথে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এটিকে ঢাল বানিয়ে ঢালাওভাবে পুরো সংগঠনকে অভিযুক্ত করা রিজভী সাহেবের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিএনপির এ ধরনের মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক অপপ্রচারে কান না দেয়ার জন্য দেশবাসী ও রাজনৈতিক সচেতন মহলের প্রতি আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।



