দুঃসময়ে দলের কাণ্ডারি লিটন

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ঘাম ঝরানো ধ্রুপদী এক ইনিংসে টেস্ট ক্রিকেটে নিজের নামের পাশে লিটন যোগ করলেন আরো একটি সেঞ্চুরি। হিসেবি ব্যাটিং, ধৈর্য, গোছানো মানসিকতা, প্রতিটি রান আদায়ের লড়াই এবং চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, সব মিলিয়ে এই ইনিংসে ধরা দিয়েছে এক ভিন্ন লিটন। যে লিটন প্রতিপক্ষের জন্য কেবলই এক বড় হুমকি। সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর হেলমেট খুলে দুই হাত প্রসারিত করে ড্রেসিংরুমের দিকে তাকিয়ে থাকেন লিটন। সেখানে দাঁড়িয়ে সতীর্থরা তাকে অভিনন্দন জানান। সেঞ্চুরিয়ানও উপভোগ করেন বিশেষ সেই মুহূর্ত। ব্যাট উঁচিয়ে চারপাশের দর্শকদের ভালোবাসার জবাব দেন ভালোবাসাতেই।

দলীয় ১১৬ রানে পুল শট খেলে মিরাজ যখন সাজঘরের পথ ধরলেন তখন লিটন অপরপ্রান্তে কেবল ২ রানে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের ষষ্ঠ বথ্যাটসমথ্যান ড্রেসিংরুমে। লিটনের লড়াইটা তখন শুরু হয় লেজের বথ্যাটসমথ্যানদের নিয়ে। মিশন একটাই, দলকে ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা। সেই লড়াইয়ে সঙ্গী পেলেন তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুলকে। যারা লিটনকে শুধু সাহসই দেননি বরং উইকেট আগলে রেখে দিয়েছেন যুদ্ধের প্রেরণা, লড়াইয়ের জেদ।

তাইজুলের সাথে সপ্তম উইকেটে লিটনের জুটি ৬০ রানের। দু’জন মিলে বল খেলেছেন ১১৪টি। অষ্টম উইকেটে তাসকিন ও লিটন ৪২ বলে যোগ করেন ৩৮ রান। নবম উইকেটে শরিফুল ও লিটনের শেষ জুটি ৬৪ রানের। যা হয়েছে ৭৩ বলে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিটাই এসেছেন নবম উইকেটে।

দলকে ধ্বংসস্তুপ থেকে টেনে তুলে অভাবনীয় ইনিংস খেলার রেকর্ড আগেও আছে লিটনের। আছে পাকিস্তানের বিপক্ষেও। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই বছর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে লিটন ও মিরাজ ১৬৫ রানের জুটি গড়েন। প্রায় শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে লিটন ওই ইনিংসে একাই করেন ১৩৮ রান।

২০২১ সালে চট্টগ্রামে ৪৯ রান তুলতে ৪ উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে মুশফিকুরকে নিয়ে তার জুটি ছিল ২০৬ রানের। মুশফিকুর ৯ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করলেও লিটন ১১৪ রান করেন অনায়েসে। কথ্যারিয়ার সেরা ইনিংসটি ১৪১ রানের। ওই ইনিংস যখন খেলতে নামেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তখন দলের স্কোর ৫ উইকেটে ২৪। মুশফিকুর নিয়ে তার জুটি ২৭২ রানের।

গতকালের ইনিংসটা অবশ্য ভিন্ন মাত্রার। কেননা লড়াইটা হয়েছে প্রতিষ্ঠিত বথ্যাটসমথ্যান ছাড়া। লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে তার অপ্রতিরোধ্য লড়াই বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে সম্মানজনক অবস্থানে। ২৭৮ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস। যেখানে লিটনের একার রান ১২৬। ১৫৯ বলে ১৬ চার ও ২ ছক্কায় সাজানো তার গর্ব করার মতো ১২৬।

পাকিস্তানের বিপক্ষে লিটনের লড়াইটা ছিল হিসেব কষে করা। তাইজুল, তাসকিন, শরিফুলদের ওপর নিজের আস্থা থাকলেও তাদেরকে পাকিস্তানের বোলারদের সামনে পড়তে দেননি। ওভারের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ বলে নিয়েছেন সিঙ্গেল। আর নিজের খেলা ওভারের শুরুর ব্যাটিংয়ে খুঁজেছেন চার কিংবা ছয়। কখনো ডাউন দ্য উইকেটে, কখনো জায়গায় দাঁড়িয়ে করেছেন পুল কিংবা হুক। স্পিনার সাজিদ খানকে অনেকবার সুইপ শটে নাস্তানাবুদ করেছেন। মিড উইকেট, ডিপ মিড উইকেট, ফাইন লেগ কিংবা লং অন ও বা অফ বাউন্ডারি দিয়ে লিটন যতবার বল বাউন্ডারিতে পাঠিয়েছেন ততবারই গ্যালারি জেগে উঠেছে।

৯৩ রানে থেকে খুররাম শাহজাদকে ফ্লিক করে চার মেরেছেন। ৯৭ রানে থেকে ওভারের দ্বিতীয় বলে নেন ১ রান। ওভারের বাকি চার বলে তখন শরিফুলের টিকে থাকার লড়াই। কোনো মতে তা পার করে দেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। পরের ওভারে সাজিদ খানের বল ড্রাইভ করে কাভারে পাঠিয়েছিলেন। দৌড়ে ২ রান নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফিল্ডারের হাতের নাগালে বল থাকায় ১ রানে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। ৯৯ রানে নট আউট লিটন। ৫ মিনিটের অপেক্ষার পর লিটন নতুন ওভারের দ্বিতীয় বলে চার মেরে পৌঁছে যায় সেঞ্চুরির স্বর্গে।

দ্বিতীয় দিনেই লিড নিতে চান লিটন

২৫৭ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দিন শুরু করবে পাকিস্তান। বাংলাদেশের লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব পাকিস্তানকে অলআউট করে কিছু রান হলেও লিড নেয়া। ম্যাচ শেষে দ্বিতীয় দিনের পরিকল্পনা নিয়ে লিটন বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব যে রানগুলো দিয়েছি, সেখান থেকে যেন লিড নিতে পারি। সিলেটের উইকেটটা এখন অনেকটাই ব্যাটিং-ফ্রেন্ডলি হয়ে গেছে। কন্ডিশনটা যদি এমন না হতো, হয়তো প্রথম দিন থেকেই ব্যাটিং সহজ হয়ে যেত। এখন দেখা যাক, কাল (আজ) সকালে যদি আবার ওয়েদারটা মেঘলা থাকে এবং আমরা যদি বোলিং করি, তাহলে ওই ১০টা ওভার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখান থেকে যদি এক-দুইটা উইকেট নিতে পারলে ওরা ব্যাকফুটে চলে যাবে।’

যদিও পুরো বিষয়টাই নির্ভর করছে বোলারদের ওপর। লিটনের পরামর্শ, ‘বোলারদের দায়িত্বটা অনেক বেশি। একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে যে আউটফিল্ডটা খুবই স্লো, বাউন্ডারির জন্য বল অনেক জোরে মারতে হয়। বোলারদের অ্যাকুরেসি আরো ভালো করতে হবে।’

দিনটিকে একেবারে খারাপ বলতে নারাজ লিটন, ‘দিনশেষে ওভারঅল খুবই ভালো। কারণ দেখেন, টসটা অনেক বড় একটা ফ্যাক্টর ছিল। উইকেটে শুরুতে ব্যাটিং করা খুব একটা সহজ ছিল না। তবে এখন উইকেট আরো ভালো হয়েছে। আমাদের চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। আপনি যদি স্টিল ভালো জায়গায় বল করে যান অনেক লম্বা সময়ের জন্য, হয়তো তারা ভুল করবে এবং সেই ভুলগুলো আমাদের কাজে আসবে।’