মাদকের উৎস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসন

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
  • বেশির ভাগ আসে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে
  • তদারকি বাড়ানো দরকার : বিশেষজ্ঞ অভিমত

সীমান্ত ও আকাশপথে মাদক আসা বন্ধ করতে প্রশাসন চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, সরকার দেশে মাদকের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে সরবরাহ বা উৎস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে; যা দিয়ে কখনো মাদকের উৎস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত দিয়ে সব ধরনের মাদক আসছে দেশে। সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, বাংলাদেশকে টার্গেট করে সীমান্তের ওপারে তৈরি হয়েছে মাদকের কারখানা। এতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে মাদক আটক ও কারবারিদের গ্রেফতার করলেও মূল উৎস ধ্বংস করতে পারছে না।

মাদকের মূল উৎস : বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের মূল উৎস হলো পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাচালান বা অবৈধ সীমান্ত পারাপার। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দেশের বেশির ভাগ মাদক মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে আসে। দেশের ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার প্রায় ১৬২টি রুট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক আসছে। বর্তমানে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম হয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারী-মানকাচর সীমান্ত দিয়েও ঢুকছে। এমনকি ইয়াবা কারখানার অবস্থান এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (কোচবিহার ও ২৪ পরগনা), আসাম ও মেঘালয় সীমান্তেও শনাক্ত হয়েছে। ফেনসিডিলের প্রধান রুট হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, যশোর, দিনাজপুর এবং রাজশাহী, কুমিল্লার অঞ্চলের সীমান্ত এলাকা ফেনসিডিল পাচারের জন্য বহুল ব্যবহৃত।

মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাদক ঢুকছে। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারে সাগরপথ দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা ও আইস। এ ছাড়াও হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকের রুট হিসেবে ট্রানজিট পয়েন্ট ধরা হয়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ি ও চুয়াডাঙ্গার দশমিনা। সিলেটের সীমান্তের ওপারের আসাম থেকে আসে গাঁজা। ওই গাঁজা রেলপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়। এর মধ্যে মিয়ানমার সীমান্ত সবচেয়ে বড় উৎস। বাংলাদেশে ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। টেকনাফ ও কক্সবাজারের সমুদ্র ও স্থল সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান আসে।

তা ছাড়া মিয়ানমার থেকে নদী ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আইস পাচার করা হয়। দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা রাজশাহী, নওগাঁ, জামালপুর এবং দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি এলাকায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি গাঁজা উৎপাদন করা হয়। বিশেষ করে আইস ও ইয়াবা মিয়ানমার, ফেনসিডিল ভারত, হেরোইন ও কোকেন ভারত হয়ে এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরান রুট হয়ে দেশে আসে।

গবেষণা তথ্য মতে : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসাল্ট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে পরিচালনায় জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় চার দশমিক ৮৮ শতাংশ। একজন মাদক ব্যবহারকারী মাসে গড়ে প্রায় ছয় হাজার টাকা ব্যয় করে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সংখ্যার দিক থেকে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করছে ঢাকা বিভাগে, প্রায় ২২ লাখ ৮৮ হাজার জন। এরপর চট্টগ্রামে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার ও রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮১ হাজার মানুষ মাদক ব্যবহার করছে। এ ছাড়াও বরিশালে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা চার লাখ চার হাজার ১১৮ জন, খুলনায় সাত লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহে সাত লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহীতে পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন ও সিলেটে চার লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন।

মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ : শিগগিরই মাদক নির্মূলে বিশেষ অভিযান শুরু হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে শিগগিরই দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং খুব দ্রুতই সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে এ সমস্যা মোকাবেলা করা হবে। এ বিষয়ে কার্যকর সমাধান খুঁজতে সরকার গবেষণা চালাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার অঞ্চলে এ সমস্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পয়েন্টে নজরদারি বাড়িয়ে সুসংগঠিত অভিযানের মাধ্যমে মানব পাচার দমনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সমাজ থেকে মাদক, জুয়া ও মানব পাচারের মতো অপরাধ নির্মূলে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো: আব্দুল হালিম রাজ বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রতিনিয়ত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান করে আটক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তা ছাড়া চোরাচালানের বন্ধে টাস্কফোর্স দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। সারা দেশে মাদকের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে আটক ও আলামত উদ্ধার করা হয়। এর পাশাপাশি মাদক নিরাময়ের ও নিয়ন্ত্রণে কিছু অ্যাওয়ারন্যাস অনুষ্ঠান করা হয়। সীমান্ত এলাকায় আমাদের বিশেষ দল রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিজিবিদের সহায়তায় এসব কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। বিশেষ করে টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় একটি বিশেষ জোন করা হয়েছে; যাতে সেই এলাকায় কোনো ধরনের মাদকের কারবারি করতে না পারে। তা ছাড়া প্রতি জেলাভিত্তিক কার্যক্রম চলমান আছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্সনীতি বজায় রেখেছি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদক প্রতিরোধ একটি সামাজিক আন্দোলন ও একটি সামাজিক যুদ্ধ। সম্মিলিতভাবে আমাদের মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। মাদক নির্মূলে পরিবার থেকেই প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসাসেবা বিস্তারের লক্ষ্যে ঢাকা বিভাগের বাইরে আরো সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যা করে সাতটি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প বর্তমান সরকার অনুমোদন দিয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানায়, দেশে অবৈধ মাদকের প্রবাহ রোধ, ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহার্য বৈধ মাদকের শুল্ক আদায়সাপেক্ষে আমদানি, পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করছে। মাদকদ্রব্যের সঠিক পরীক্ষণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ, মাদকদ্রব্যের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরোধ কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, জাতিসঙ্ঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে নিবিড় কর্ম-সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ করে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞের মত : সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধানত সীমান্ত এলাকায় তদারকি বাড়ানো দরকার। তা ছাড়া বিদেশ থেকে বিমানবন্দর হয়ে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে আসছে। যারা এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকেন তাদের কেউ কেউ এতে জড়িত থাকেন। এতে কারবারিরা আরো সুযোগ পায়। এ ক্ষেত্রে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া দরকার। অধিকাংশ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকসহ আটক করে খুচরা বিক্রেতা ও বাহকদের মামলা দেয়; অথচ এদের পেছনের যারা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সরকারের উচিত মাদকের সাথে জড়িত সব রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। কোনো সরকারই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। সব সময়ই বলে তালিকা করা হচ্ছে, তারা বারবার লোকদেখানো কথা বলে থাকে।

তিনি আরো বলেন, মাদক এখন ব্যক্তির পছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ব্যক্তিকে এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে। রাষ্ট্রের জিরো টলারেন্স নীতি শুধু মুখেই আছে বাস্তবে নেই। আমরা এটার মানে বুঝে না বুঝে কথা বলছি। এই নীতি যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি এমন হতো না।

আমাদের দেশে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে; যা দিয়ে কখনো মাদকের উৎস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দেশের দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত এলাকা দিয়ে সব মাদক ঢুকছে। তারা বাংলাদেশকে টার্গেট করে মাদকের কারখানা গড়ে তুলেছে। তাই আগে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলে চাহিদা এমনিতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা মানে মাদক কারবারিদের সুযোগ করে দেয়া। তা ছাড়া আমাদের দেশে এই মডেল কাজ করবে না।