গুমের তদন্ত মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ারে থাকছে না

অংশীজন সভায় আইনমন্ত্রী

গুমের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সাথে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং গুমের শাস্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি অসঙ্গতি ও ‘গ্যাপ’ দূর করতে একটি যুগোপযোগী ও যৌক্তিক আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

গুমের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সাথে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং গুমের শাস্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি অসঙ্গতি ও ‘গ্যাপ’ দূর করতে একটি যুগোপযোগী ও যৌক্তিক আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে রোববার বিকেলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে অংশীজন সভা’য় সভাপতির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, এমপি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দস কাজল, সানজিদা ইসলাম, এমপি এবং বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার।

আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে আগের বিতর্কিত আইন ও অধ্যাদেশের ভেতরে থাকা বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বিষয় এবং আইনি ত্রুটিগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারায় যে অসঙ্গতি রয়েছে, তা দূর করা প্রয়োজন। ওই ধারায় বলা হয়েছে, গুমের উদ্দেশ্যে কেউ অপহরণ করলে তার শাস্তি হবে যাবজ্জীবন বা অনধিক ১০ বছর, অথচ অন্য জায়গায় বলা হয়েছে গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু লাশ বা ভিকটিমকে যদি পাওয়াই না যায়, তবে সে ক্ষেত্রে কী হবে তা নিয়ে ভুক্তভোগীদের একটি বড় এবং যৌক্তিক অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত. পদ্ধতিগত ও ব্যাপক মাত্রার গুমের যে বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচার্য, তার সাথে এই আইনের কোনো পার্থক্যের জায়গা স্পষ্ট করা হয়নি। সরকার এই সুনির্দিষ্ট আইনি ত্রুটি ও ‘গ্যাপ’গুলো অ্যাড্রেস করার চেষ্টা করছে। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সরকার মনে করে না যে তাদের চিন্তাই চূড়ান্ত। অংশীজনদের ধারণা ও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য গ্রহণ করে একটি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য আইন পাস করাই এই সভার মূল লক্ষ্য। সরকার এমন একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান চায়, যা মানুষকে কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে মানবাধিকার রক্ষা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ করে দেখাবে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির প্রস্তাবিত এই আইনের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন করেন আইনমন্ত্রীর কাছে। জাবাবে আইনমন্ত্রী বলেছেন, আপনার প্রস্তাবগুলো লিখিত আকারে দিলে আমরা এ বিষয়টি বিবেচনা করব। এবং ঈদের পরে এইভাবে অংশীজন সভা করে কতটুকু গ্রহণ করেছি। বা কেন বাদ দিয়েছি তা নিয়ে আলোচনা করব।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গুম কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন ড. নাবিলা ইদ্রিস। তিনি এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রস্তাবিত এই আইন প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, অধ্যাদেশ এবং এখন যে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া আনা হয়েছে এটার মধ্যে অনেক ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গুম আইন যেটা আনা হয়েছে সেখানে ইনভেস্টিগেশন করবে পুলিশ, জিডি করতে হবে পুলিশের কাছে বা ম্যাজিস্টেটকে জানাতে হবে তবে তদন্ত পুলিশই করবে। আবার ওই দিকে ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের ওখানে আবার ২০০৯ সালের শেখা হাসিনার আইনের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের ইনভেস্টিগেশনের ক্ষমতা খর্ব করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে বেসিকেলি যেই বাহিনী দোষ করেছে সেই বাহিনীর প্রধানকে জিজ্ঞাসা করতে হবে যে আপনার কর্মকর্তা কী দোষ করেছে? করলে কী করেছে? এই দু’টি যত দিন থাকবে তত দিন দুইটি আইন কার্যকর হওয়া পসিবল না।

সভায় উপস্থাপিত খসড়া আইনের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে ‘গুম’ সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়টি সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয়েছে। গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্ত কিভাবে হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে ‘গুম অধ্যাদেশ’-এ নির্ধারিত থাকবে। পর্যালোচনায় বলা হয়, গুমের মতো ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য মানবাধিকার কমিশনের নেই এবং পৃথিবীর কোথাও মানবাধিকার কমিশন এই ধরনের অপরাধের ফৌজদারি তদন্ত করে না, যা আইনের মৌলিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পরিপন্থী।

একই সাথে আগের অধ্যাদেশের ৩(২) ধারার সমালোচনা করে বলা হয়, সেখানে বলা হয়েছিল রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গের সাথেই কমিশনের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। এটি সম্পূর্ণ অসংবিধানিক এবং এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। আইন দ্বারা অবারিত বা ‘যেকোনো আদেশ’ দেয়ার ক্ষমতা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়া যায় না বরং আইনের মাধ্যমেই তার সুনির্দিষ্ট সীমা ও কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করতে হয়। নতুন প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি ও পেশাগত অসদাচরণের সংজ্ঞা যুক্ত করা হচ্ছে, যা আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো অপসারণের কথা বলা হলেও স্পষ্ট ছিল না।

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তর্জাতিক মানের করা হয়েছে। বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসমর্থন করেছে এবং আন্তর্জাতিক প্রথাবদ্ধ আইন দ্বারা যা স্বীকৃত, তার লঙ্ঘনকেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। বাছাই কমিটিতে নাগরিক প্রতিনিধি ও মানবাধিকারের অধ্যাপকদের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ করা হয়েছে এবং একজন সার্বক্ষণিক কমিশনারের বিধান রাখা হয়েছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আগের ‘অনুসন্ধান ও তদন্ত’ এই দ্বিমুখী ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার প্রাথমিক যাচাই করে যদি আপাতদৃষ্টে ঘটনার সত্যতা পান, তবে কোনো ইনকোয়ারি ছাড়াই সরাসরি তদন্ত শুরু হবে, যা মানুষের দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করবে। বিশেষ বিধান হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে যে, তদন্ত চলাকালীন যদি কোনো আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পাওয়া যায় এবং সেই বিষয়ে মামলা দায়ের করা থাকে, তবে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট কমিশনারের নির্দেশে আসামিকে গ্রেফতার করে নিয়মিত মামলায় সোপর্দ করতে পারবেন।

আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হলে তা ‘পেশাগত অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার বিরুদ্ধে সরাসরি বিভাগীয় মামলা হবে। ডিকটেটরি বা একতরফা সিদ্ধান্ত ঠেকাতে আইনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘রিভিউ’-এর বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে যেকোনো আদেশের বিরুদ্ধে ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।

আইনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মানবাধিকার কমিশনের তৈরি তদন্ত প্রতিবেদনটি আদালতে বিচারের সময় ‘সাক্ষ্য’ হিসেবে পেশ করা যাবে, যা এর আইনি গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের মাপকাঠি আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে এবং কমিশনের সুপারিশ কিভাবে বাধ্যতামূলক হবে তাও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। কমিশনের আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য আগের তহবিল ব্যবস্থা পরিবর্তন করে এটিকে ‘কনসোলিডেটেড ফান্ড’ বা সরকারের রেভিনিউ বাজেটের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে কমিশনের ‘সোমোটো’ বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবেদন তলব করার স্পষ্ট এখতিয়ার রাখা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন বাহিনী প্রধান ও সরকারকে সুপারিশ করবে এবং ছয় মাসের মধ্যে কী ব্যবস্থা নেয়া হলো তা কমিশনকে জানাতে হবে। বাংলাদেশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গুম বিরোধী সনদ রেটিফাই করায় আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণ করেই এই আইনের খসড়া করা হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে কোনো নোটিশ ছাড়াই সরাসরি যেকোনো স্থান পরিদর্শনের পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে অংশীজন সভায় বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, কেবল আইনি সংস্কারই যথেষ্ট নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সবার মানসিকতার পরিবর্তন এবং দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। খসড়া প্রস্তাবনার ওপর উন্মুক্ত আলোচনার পর অংশীজনদের মূল্যবান মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে এই বিলটি চূড়ান্ত আইনি রূপ পাবে।