পুঁজিবাজারের সপ্তাহ কাটল ব্যাংক বীমার দাপটে

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১১ দশমিক ৭২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ব্যাংক ও বীমা প্রধান এ দু’খাতের দাপটের মধ্য দিয়েই বিদায়ী সপ্তাহ কাটাল পুঁজিবাজার। লেনদেন ও মূল্যবৃৃদ্ধি দু’দিক থেকেই গত সপ্তাহে এগিয়ে ছিল এ দুই খাতের কোম্পানি। তবে সপ্তাহে শুরুতে খাতগুলোর যে চিত্র ছিল তার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে সপ্তাহের শেষ দু’দিন। এ সময় লেনদেনে এ দু’টি খাত এগিয়ে থাকলে বাজারের নেতিবাচক আচরণের শিকার হয়ে দরপতন ঘটে দুই খাতেরই। এতে সপ্তাহের শুরুতে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচকগুলো ভালো অবস্থান ধরে রাখতে পারলেও শেষ দিকে এসে পতন সামাল দিতে পারেনি।

গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১১ দশমিক ৭২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২৯৮ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট থেকে রোববার সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে নেমে আসে ৫ হাজার ২৮৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ২ দশমিক ০৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে ১৩ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট। সপ্তাহের মোট পাঁচটি কর্মদিবসের মধ্যে তিনটিতে সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটলেও পতন ঘটে দু’টিতে।

সাধারণত বছরের এ সময়টিতে অর্থবছর শেষ করা প্রধান দু’টি খাত ব্যাংক ও বীমা বার্ষিক আয় ব্যয়ের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি বিগত বছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করে। গত সপ্তাহে এ দুই খাতে বেশি কয়েকটি কোম্পানি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভালো মুনাফার উল্লেখ ছিল। একই সাথে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় লভ্যাংশ ঘোষণায়ও এগিয়ে থাকে ব্যাংকগুলো। এতে বিনিয়োগকারিদের প্রচুর আগ্রহ কাড়ে এসব কোম্পানি। এরই প্রতিফলন ঘটে কোম্পানিগুলোর লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে। ফলে এ সময় ব্যাংক ও বিমার দাপটে বাজারের অন্য খাতগুলো হালে পানি পায়নি।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পর ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের প্রতিফল ঘটেছে। এ খাতেরই কয়েকটি কোম্পানি নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার হওয়ায় দীর্ঘদিন পুরো ব্যাংকিং খাতেই বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা বিরাজ করছিল। অথচ এ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি এ সময় ভালো পারফর্ম করে যা প্রকাশ পায় তাদের বিগত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে। একই সাথে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম ছিল। এতে দীর্ঘদিন পর ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কাড়তে সক্ষম হয়। একই কারণে বীমা খাতও সম্প্রতি বেশ ভালো করছে। দীর্ঘদিন ধরে এ খাতের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার ফলে আগের চাইতে এখন বিমা খাতে মুনাফা বাড়ছে। সে তুলনায় খাতটির মূল্যস্তর ছিল অনেক নীচে। সম্প্রতি এ খাতটি আবার বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পাচ্ছে। ২০২৩ সালের পর থেকেই ধুঁকছিল বীমা খাত।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৪ হাজার ৭১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ৪ হাজার ৫১৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বাজারটির দৈনিক গড় লেনদেনও। আগের সপ্তাহে ডিএসইতে গড় লেনদেন ছিল ৯০২ কোটি টাকা, যা গত সপ্তাহে ৯৪৩ কোটি টাকায় পৌঁছে।

গত সপ্তাহে (২৬-৩০ এপ্রিল) ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং কোম্পানি সিটি ব্যাংক। কোম্পানিটির গড়ে প্রতিদিন ৩৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল করতে সক্ষম হয় যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। গড়ে প্রতিদিন ৩৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক। মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ দখলে রাখে কোম্পানিটি। ডিএসইতে লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, লাভেলো আইসক্রিম, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, যমুনা ব্যাংক, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স ও শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।

বিদায়ী সপ্তাহে দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের। সপ্তাহজুড়ে বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানটির দর বেড়েছে ২৭.৪৩ শতাংশ। আগের সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে কোম্পানিটির দর ছিল ৭২ টাকা ৯০ পয়সা। বিদায়ী সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে যার ক্লোজিং দর দাঁড়িয়েছে ৯২ টাকা ৯০ পয়সায়। সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল এনসিসি ব্যাংক। আগের সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। বিদায়ী সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ক্লোজিং দর দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৯০ পয়সায়। সপ্তাহের ব্যবধানে কোম্পানিটির দর বেড়েছে ২৫.১৯ শতাংশ। ডিএসইর সাপ্তাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইয়াক্বিন পলিমার, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং, সাফকো স্পিনিং, জাহিন টেক্সটাইলস, আজিজ পাইপস, আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড ও বিডি থাই ফুডস।

একই সময় ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স। কোম্পানিটি গত সপ্তাহে ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ দর হারায়। ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারিয়ে তালিকার

দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। সপ্তাহটিতে ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন), ফারইস্ট ফিন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইস্টার্ন ক্যাবলস, প্রিমিয়ার লিজিং, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, এফএএস ফিন্যান্স ও প্রাইম ব্যাংক।