আগ্নেয়গিরির শব্দ শুনুন

ইরান, ইরাক, মিসর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশের সরকারেরও একই অবস্থান, তাদের বিষয়গুলো একেবারে ঠিকঠাক আছে। কেউই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশে নিষেধাজ্ঞার কারণে যুবকদের মধ্যে বর্তমান অস্থিরতার কারণ পর্যালোচনা করতে প্রস্তুত নয়। বর্তমানে তো ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধ এ অস্থিরতা ও বিদ্বেষকে কিছুটা লাগাম দিয়ে রেখেছে; কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর এ অস্থিরতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে

আমরা এক আগ্নেয়গিরির মুখের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের পায়ের নিচে ভূগর্ভে বেশ অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতা অনুধাবনের জন্য মাটির সাথে কান লাগানো জরুরি। কিন্তু আমাদের বেশি মনোযোগ মাটির ওপরে চলমান অস্থিরতার প্রতি। মাটির ওপরের চলমান অস্থিরতার মাটির নিচের অস্থিরতার বেশ গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের শুধু সেই আগুন চোখে পড়ে, যা ঘৃণার আকারে মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্কে উদগীরণ হচ্ছে। ওই আগুনের ফলাফল এখন যুদ্ধ, সংঘর্ষ, হত্যা হানাহানির আকারে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যে আগ্নেয়গিরি ভূগর্ভে আছে, তা শুধু একটি জাতি ও দেশ নয়; বরং পুরো অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের ধ্বংসের কারণ হতে পারে।

এই আগ্নেয়গিরিটিকে বোঝার জন্য আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে যাচ্ছি। ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়। কিন্তু কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন জিতে কলকাতাতেও গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জি ২০১১ সাল থেকে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলমান ও ২৩ শতাংশ দলিত নাগরিকদের সহায়তায় এখানে বিজেপির পথ রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার মুসলমান ও দলিত ভোটারদের প্রভাবহীন করার জন্য একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সর্বপ্রথম নাগরিক আইন ২০১৯-এর মাধ্যমে লাখ লাখ মুসলমানের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। যে কয়েকজন অবশিষ্ট থাকেন ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লক্ষাধিক মুসলমান ও দলিত ভোটার বাদ দেয়া হয় এবং সাত লাখ নতুন ভোটার যুক্ত করা হয়।

বিভিন্ন আসনকে টার্গেট করে ভোটার তালিকাগুলোতে এমন পরিবর্তন করা হয় যে, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন বিজেপির হাতে তুলে দেয়া হয়। যখন ভোটার তালিকায় কারচুপি করা হয়েছিল, তখন মমতা ব্যানার্জি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন; কিন্তু সেখানে তিনি ন্যায়বিচার পাননি। বিজেপি নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টসহ মিডিয়াকেও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর বিজেপি ও আরএসএস পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহরে মুসলমানদের ওপর হামলা শুরু করে দিয়েছে। এই হামলাগুলোর ফলাফল কী দাঁড়াবে? পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলমান নাগরিকদের যুবকরা আরএসএসের মোকাবেলা করার জন্য সশস্ত্র পথ বেছে নেবে। এ সুযোগে উগ্র গোষ্ঠীর জনশক্তি ও সমর্থন আরো বেড়ে যাবে। তাদের কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা হবে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েন বেড়ে যাবে।

বিজেপির নীতির কারণে পুরো ভারতে মুসলমান আগের চেয়ে আরো বেশি অনিরাপদ হয়ে যাবে। অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরেও অত্যাচার বেড়ে যাবে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও বাড়বে। ওই প্রতিরোধের দায় চাপানো হবে পাকিস্তানের ওপর। ভারতের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানের পথ হয়ে পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ বাড়বে এবং এভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেও সম্পর্ক নষ্ট হবে। ভারতে গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ার কারণে যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে, তা আগুন হয়ে পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করবে। গণতন্ত্রের দুর্বলতা থেকে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান স্বৈরশাসন বা একনায়কতন্ত্র হতে পারে না।

এখন একটু ভাবুন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মিডিয়া যা কিছু বলছে, ঠিক সে কথাগুলোই কি ২০২৪ সালের পাকিস্তানের নির্বাচনের ব্যাপারে বলা হয়নি? আজ ভারতের নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আরোপ করা হচ্ছে, ঠিক একই অভিযোগ কি পাকিস্তানের এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরোপ করা যায় না? সময় অতিবাহিত হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের তথাকথিত স্বাধীন মিডিয়ায় নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের ব্যাপারে সমালোচনা কমে গেছে। কেননা, ভারতের মতো পাকিস্তানেও মিডিয়ার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বেড়ে গেছে। এখন আসুন এই আগ্নেয়গিরির দিকে দৃষ্টি দিই, যার প্রতি আমাদের মনোযোগ দেয়া জরুরি। এ আগ্নেয়গিরি মূলত সেই উগ্রবাদ ও সশস্ত্র সহিংসতা, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার কারণে আমাদের যুবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

কয়েক দিন আগে চারসদ্দার প্রসিদ্ধ আলেমে দ্বীন মাওলানা শায়েখ মুহাম্মদ ইদরিসকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। শায়েখ মুহাম্মদ ইদরিস খায়বারপাখতুনখাওয়া অ্যাসেম্বলির সাবেক সদস্য ছিলেন। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবর্তে রাজনৈতিক আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন। কিছু দিন থেকে তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল, তিনি যেন গণতন্ত্র ও সংবিধানকে সহায়তা ছেড়ে দেন। তার ছাত্ররাও তাকে জিজ্ঞাসা করতেন, যে গণতন্ত্রে ন্যায়বিচার নেই এবং যে সংবিধানকে ক্ষমতাবান মানুষেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছে সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে কী লাভ? শায়েখ মুহাম্মদ ইদরিস হুমকি সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন অব্যাহত রাখেন এবং অবশেষে গুলির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। গতানুগতিক নিয়মমাফিক তার টার্গেট কিলিংয়েও আফগানিস্তানের সম্পৃক্ততা আছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের যুবকদের এত সহজে কেন বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এটি শুধু পাকিস্তানের সমস্যা নয়; অধিকাংশ মুসলিম দেশের যুবকদের মধ্যে উগ্রবাদ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে আমার বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত এবং খোঁজ করা হচ্ছে এমন নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার সুযোগ হয়। তাদের মধ্যে কিছু এমনও ছিলেন, যারা রাজনৈতিক আন্দোলন ছেড়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ অবলম্বন করেছেন। ওই নেতাদের বক্তব্য, যখন তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে গেল, তখন তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যালটের পরিবর্তে বুলেটের পথ বেছে নিলেন। এ ব্যাপারে সবসময় মিসরের উদাহরণ দেয়া হয়, যেখানে ভোটের শক্তি নিয়ে মুহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় আসেন; কিন্তু পশ্চিমা শক্তিগুলো সেনা বিদ্রোহের মাধ্যমে মুহাম্মদ মুরসির সরকারকে উল্টে দেয়। এরপর মুহাম্মদ মুরসির সমর্থক বহু যুবক উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তানের অবস্থা মিসর থেকে ভিন্ন। তবে এখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে থেকেও রাজনৈতিক আন্দোলনের সহায়তাকারী উলামায়ে কেরামকে টার্গেট বানানোর ঘটনা বেড়ে চলেছে। এ ঘটনাগুলো আমাদের সেই আগ্নেয়গিরির সন্ধান দিচ্ছে, যা এখনো মাটির নিচে রয়েছে।

ইসলামাবাদ, লাহোর বা করাচিতে বসে বেশি কিছু আমাদের নজরে পড়বে না। কিন্তু যদি আপনি পেশোয়ার বা ডেরা ইসমাইল খানের দিকে যান, তাহলে আপনি ভূগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পাবেন। আপনি কোয়েটা বা তুরবাতের দিকে যদি যান, তাহলে আপনি মাটিতে এমন ফাটলও দেখতে পাবেন, যেখান থেকে আগ্নেয়গিরির লাভা বের হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। এ সব অস্থিরতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যদি ক্ষমতাসীনদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলি, তাহলে তারা বলবে— নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা যা কিছুই করছে, আইন মোতাবেক করছে। সব ঠিক আছে। তাদের অবস্থান হচ্ছে— সব অস্থিরতা ভারত ও আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। ইরান, ইরাক, মিসর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশের সরকারেরও একই অবস্থান, তাদের বিষয়গুলো একেবারে ঠিকঠাক আছে। কেউই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশে নিষেধাজ্ঞার কারণে যুবকদের মধ্যে বর্তমান অস্থিরতার কারণ পর্যালোচনা করতে প্রস্তুত নয়। বর্তমানে তো ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধ এ অস্থিরতা ও বিদ্বেষকে কিছুটা লাগাম দিয়ে রেখেছে; কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর এ অস্থিরতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কেননা, শত্রু এ অস্থিরতাকে আমাদের পরস্পরের মধ্যে লড়াই বাধানোর জন্য ব্যবহার করবে। এ জন্য মাটিতে কান পেতে আগ্নেয়গিরির শব্দ শুনতে কোনো অসুবিধা নেই।

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৭ মে, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর

ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

[email protected]

হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট