পররাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন মোড়

বাংলাদেশ-পাকিস্তান গোয়েন্দা বিনিময় চুক্তি ও ভারতের উদ্বেগ

দীর্ঘ কয়েক দশকের শীতল সম্পর্কের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ১০ বছর মেয়াদি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রস্তাবিত চুক্তির খবর দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা- বিশেষ করে ১০ বছর মেয়াদি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রস্তাবিত চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করেছে

দীর্ঘ কয়েক দশকের শীতল সম্পর্কের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ১০ বছর মেয়াদি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রস্তাবিত চুক্তির খবর দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করেছে।

১. গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও কৌশলগত শিফট : ডিফেন্স রিসার্চ ফোরামের (ডিআরএফ) তথ্য মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ১০ বছরের জন্য গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ভারতের উদ্বেগ : নয়াদিল্লি এই চুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রাধান্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবর্তিত সমীকরণ : কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতি ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। পাকিস্তানের সাথে এই নতুন সমঝোতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ঢাকা এখন তার বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতিতে ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী ভারসাম্যের পথে হাঁটছে।

২. সন্ত্রাসবাদ দমন ও আইনি সহযোগিতা

গত ৮ মে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পাকিস্তান একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তাব করেছে, যা বর্তমানে ঢাকা পর্যালোচনা করছে। এই প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো হলো :

সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা : আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যৌথ উদ্যোগ।

নথিপত্র জালিয়াতি রোধ : পাসপোর্ট বা অন্যান্য সরকারি নথি জালিয়াতি বন্ধে প্রযুক্তিগত ও তথ্যগত সহযোগিতা।

আইনি পর্যালোচনা : প্রস্তাবিত চুক্তিটি বর্তমানে আইনি যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

৩. ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কতা

ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, বরং এটি একটি ‘বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন’।

আঞ্চলিক প্রভাব : পাকিস্তান-বাংলাদেশ এই ঘনিষ্ঠতা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ভারতের যে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তাতে ফাটল ধরাতে পারে।

প্রতিরক্ষা সমীকরণ : গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের অর্থ হলো- আঞ্চলিক নিরাপত্তা অবকাঠামোতে এখন থেকে পাকিস্তানের একটি পরোক্ষ ভূমিকা তৈরি হবে, যা দিল্লির জন্য অস্বস্তিকর।

ভারতীয় থিংক-ট্যাংক ও বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া

ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং আইডিএসএ (মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস) ও ওআরএফ (অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন)-এর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই পরিবর্তনকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে চিহ্নিত করছে :

ভারতীয় বিশ্লেষকদের প্রধান উদ্বেগ হলো, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যদি বাংলাদেশের নিরাপত্তা অবকাঠামোতে সরাসরি প্রবেশাধিকার পায়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় (সেভেন সিস্টার্স) রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। উলফা বা অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচারা দিয়ে উঠতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১৫ বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে ‘সোনালী অধ্যায়’ ছিল, তা মূলত নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। এখন ঢাকা যদি ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে দিল্লির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

ভারতের সম্ভাব্য পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক পদক্ষেপ

কোন কোন বিশ্লেষকের ধারণা-দিল্লি কেবল উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তারা ঢাকাকে পুনরায় তাদের বলয়ে রাখতে কয়েকটি ফ্রন্টে কাজ শুরু করতে পারে :

প্রতিরক্ষা ঋণের চাপ : ভারত বাংলাদেশকে যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ দিয়েছিল, তার দ্রুত ব্যবহারের জন্য চাপ দিতে পারে। ভারত চাইবে বাংলাদেশ যেন তাদের থেকে উন্নত রাডার ও উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাতে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর দিল্লির কর্তৃত্ব থাকে নির্ভর করতে না হয়।

পানি বণ্টন ইস্যুকে দাবার ঘুঁটি করা : আপনার কাছে থাকা তথ্যে দেখা গেছে যে বাংলাদেশ ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারত এই মেগা প্রকল্পে কারিগরি বা আর্থিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে ঢাকাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে, অথবা তিস্তা ও গঙ্গা পানি চুক্তির দরকষাকষিকে আরো দীর্ঘায়িত করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

রোহিঙ্গা ইস্যু ও আঞ্চলিক জোট : ভারত সম্ভবত বিমসটেক বা বিবিআইএনের মতো আঞ্চলিক জোটগুলোতে বাংলাদেশকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করবে, যাতে পাকিস্তানের প্রভাব কমানো যায়।

৩. সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব

ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশের এই ‘ইউটার্ন’ বা মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট পলিসি দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সমীকরণ তৈরি করছে :

সূচক -- ভারতের অবস্থান -- বাংলাদেশের কৌশল

  • নিরাপত্তা -- একচেটিয়া প্রভাব বজায় রাখা। -- গোয়েন্দা তথ্যের উৎস বহুমুখীকরণ।
  • অর্থনীতি -- কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত করা -- পদ্মা ব্যারাজ ও রিজার্ভ সঙ্কটে বিকল্প অর্থায়ন খোঁজা।
  • প্রতিরক্ষা -- ভারতীয় সরঞ্জাম বিক্রিতে অগ্রাধিকার। -- চীন ও পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সমঝোতা বৃদ্ধি।

প্যারাডাইম শিফ্ট

২০২৬ সালের মে মাসে এসে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও পাকিস্তানের সাথে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার এই হাতবদল ইঙ্গিত দেয় যে, ঢাকা এখন থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। তবে ভারতের তীব্র উদ্বেগের মুখে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা ঢাকার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হবে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, নয়াদিল্লি বর্তমানে ঢাকাকে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক মেসেজ’ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে ঢাকার এই ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের দেয়া নিরাপত্তা গ্যারান্টিকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা ঢাকার ওপর যে আস্থা রাখত, এই ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির পর তাতে বড় ধরনের আস্থার সঙ্কট তৈরি হতে পারে।