ঢাকার প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের ২৫ শতাংশ বিলীন

দখলদার প্রায় আড়াইশ’

Printed Edition

আবুল কালাম

খাল গ্রাসে অদৃশ্য হওয়ার পথে ঢাকার প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ। অপরিকল্পিত নগরায়ন, দখল আর দূষণের কারণে ঢাকার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ খাল এখন প্রায় বিলীন। প্রায় আড়াইশ’ দখলদারের মাধ্যমে কোথাও সেগুলো পরিণত হয়েছে নর্দমায়, আবার কোথাও ভরাট করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। আর যেগুলো টিকে আছে সেগুলোর কোনোটা সঙ্কুচিত। নেই পানির প্রবাহ। আবার কোনোটা অস্তিত্ব হারিয়েছে।

মাটি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, খালের ওপর দোকান ও ঘর তৈরি, রাস্তা ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ, আবর্জনা ফেলা ও অবৈধ প্লটিংসহ নানাভাবে নগরীর এসব খাল দখল করা হয়েছে। এতে করে রাজধানীর পানিপ্রবাহ কমে জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত ক্ষতি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া ও জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে।

দখলদারদের মধ্যে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজউক, ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকল্প, আবাসন কোম্পানি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ভূমিদস্যু এবং অন্তত আড়াইশ’ ব্যক্তি। যারা খালের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এর ফলে খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানীর খাল সংখ্যা কত সে বিষয়ে সরকারি সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে ঢাকায় জীবন্ত ৬৫টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ড্যাপে বৃহত্তর ঢাকায় ২১৯টি খালের ম্যাপসহ উল্লেখ আছে।

তবে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ১৬ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে মোট ৫৮টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি খালের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে গেছে। অন্য দিকে সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী খালের সংখ্যা হতে পারে ৪৬ থেকে ৬৯টি। এর প্রায় ৭০ শতাংশ দখল হয়ে গেছে। যার কোনোটা পূর্ণ আর কিছু আংশিক সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। আবার কিছু খাল অস্তিত্ব হারিয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে। আর ১২ থেকে ১৫টি খাল ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

যদিও জেলা প্রশাসন বলছে, রাজধানীতে এক সময় প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১২৪ কিলোমিটার খাল এখন সম্পূর্ণ বিলীন। অর্থাৎ রাজধানীর প্রায় ৬৪ শতাংশ খালের কোনো অস্তিত্ব এখন আর নেই। একসময়ের প্রবহমান পরীবাগ খাল, পান্থপথ খাল, মগবাজার খাল বা ধোলাইখালের একাংশ এখন শুধুই ইতিহাস। খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বক্স কালভার্ট ও পাকা রাস্তা। বক্স কালভার্টের ভেতরে পলি ও কঠিন বর্জ্য জমে পানির স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়াও খালের ওপর গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বস্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য মতে, ঢাকার বিদ্যমান ৫৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পানিপ্রবাহের ’ব্লু নেটওয়ার্ক’ এবং ৬৫টি প্রধান খালের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি ফেলার কারণে খালগুলো উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সাথে অভ্যন্তরীণ খালগুলোর যে প্রাকৃতিক সংযোগ ছিল, স্লুইসগেট ও অবৈধ দখলের কারণে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

অপর দিকে জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন বলছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বাউনিয়া, আবদুল্লাহপুর ও দিয়াবাড়ি খালের অংশ ভরাট করেছে। এ ছাড়া কয়েকটি আবাসন প্রকল্প রামচন্দ্রপুর খালের জায়গা দখল করেছে। ভাটারা, ডুমনী, বোয়ালিয়া ও জোয়ারসাহারা-কাঠালদিয়া খালের বিভিন্ন অংশ ভরাটের অভিযোগও রয়েছে।

অন্য দিকে দক্ষিণ ঢাকা অঞ্চলের ২২টি খালের মধ্যে মাত্র কয়েকটিতে এখনো আংশিক পানি প্রবাহ রয়েছে। অনেক খাল সম্পূর্ণভাবে রাস্তা, বাজার বা স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে। যেসব খাল টিকে আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই আবর্জনা, পয়োবর্জ্য ও দখলের চাপে কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি খালের মধ্যে একমাত্র ধোলাই খালের একটা অংশ (সূত্রাপুর লোহারপুল থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত) ও মেরাদিয়া খাল সচল আছে। বাকি সব ক’টি খালের জায়গায় এখন রাস্তা। প্রতিবেদনে এমনটা বলা হলেও নন্দীপাড়া খাল এখনো সচল আছে। প্রবাহ আছে কুতুবখালী খালেও।

জেলা প্রশাসনের তথ্যনুযায়ী মিরপুর সার্কেলের বাউনিয়া খালের একাংশ ভরাট করে ফেলেছে রাজউক। একইভাবে আবদুল্লাহপুর খাল এবং দিয়াবাড়ি খালের কিছু অংশও ভরাট করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিয়াবাড়ি খালের ভরাট অংশ রাজউকের উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পে ঢুকে গেছে।

এ ছাড়া দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার জিরানী (নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী) খাল দখল করে জেলা পরিষদ মার্কেট গড়ে তুলেছে। দ্বিগুণ খাল চালু থাকলেও খালের গোড়ান-চাটবাড়ি অংশে মাহবুব উল্লাহ নামের এক ব্যক্তি আননামী ড্রিমস পার্কের নামে দখল করেছে। আর গোড়ান-চাটবাড়ি অংশে রাধাকৃষ্ণ মন্দির কর্তৃপক্ষ খাল দখল করেছে।

অন্য দিকে রামচন্দ্রপুর খালের জায়গা দখল করেছে বেশ ক’টি আবাসন প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো নবীনগর হাউজিং, জেমকন সিটি, মোহাম্মদী হাউজিং, রাজধানী উদ্যান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর সিটি করপোরেশনের বড় চারটি খাল বা খালের অংশবিশেষ বালু ফেলে ভরাট করেছে দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী গ্রুপ। খালগুলো হলো ভাটারা, ডুমনী, বোয়ালিয়া ও জোয়ারসাহারা-কাঁঠালদিয়া খাল। এর মধ্য ডুমনী খালটি পুরোপুরি অচল।

বোয়ালিয়া খালের আরেক দখলদার বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতি। ৩০০ ফুট রাস্তার সেতু থেকে খিলক্ষেত ইছাপুরা রাস্তার সেতু পর্যন্ত দুই পাশ দখল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসি বলছে, খাল উদ্ধারে সম্প্রতি সরকারি উদ্যোগে কিছু বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ঢাকার ৪টি প্রধান খাল শ্যামপুর, জিরানী, মান্ডা ও কালুনগর খাল পুনরুদ্ধারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ৮৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

অন্য দিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এসব খাল পুনরুদ্ধারে তাদের প্রণীত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ২০২২-৩৫-এ এক বিস্তৃত রূপরেখা দিয়েছে। ড্যাপের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী সবমিলিয়ে ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধারে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি লাগতে পারে।

এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ড. কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় জলাভূমি কমে যাওয়ার সাথে সাথে নগরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিগত কয়েক দশকে ঢাকায় প্রায় ৬৯ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে।

একই সময়ে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৪৪ ডিগ্রি থেকে ৯ দশমিক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই রাজধানীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এখন আর কেবল পরিবেশগত বিলাসিতা নয়, বরং ঢাকা শহরের টিকে থাকার লড়াই। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে সাধারণ বর্ষার বৃষ্টিতেই ঢাকা বসবাসের অযোগ্য এক ‘কংক্রিটের দ্বীপে’ পরিণত হবে।

অন্য দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলামের ভাষ্য, কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট, খাল দখল ও প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবক্ষয়ের কারণে পানি ব্যবস্থাপনা এখন বড় ধরনের স্থানিক পরিকল্পনা সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

অতীতে ঢাকা ও অন্যান্য নগর এলাকায় খাল ও জলাশয় দখল ও ভরাট হওয়ায় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নগর বন্যা ও জনদুর্ভোগ বেড়েছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।