আ’লীগ আমলের পুলিশের প্রভাবশালী ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখা-১ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানা যায়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন।

এই ১৭ জন কর্মকর্তা ২০০১ সালের ৩১ মে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, একজন পুলিশ সুপার (এসপি) এবং একজন উপকমিশনার (ডিসি) রয়েছেন। ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ওই সূত্র জানায়, এই ১৭ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য, দলটির সাথে পারিবারিক সম্পর্ক, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট কারসাজি, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর আগে সরকার ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে (১৪ জন ডিআইজি, ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং একজন এসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে।

গত ৩ মে ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে এবং ২২ এপ্রিল একই বিধানে ১১ জন ডিআইজি ও দু’জন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

এবার অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহীল বাকী, সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি বিধান ত্রিপুরা, পুলিশ স্টাফ কলেজের অতিরিক্ত ডিআইজি ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন, বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমি (বিপিএ) সারদার ডিআইজি মো: ওয়ালিদ হোসেন, এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি সহেলী ফেরদৌস, সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা, সারদার অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মো: হাবিবুর রহমান, পুলিশ টেলিকমের অতিরিক্ত ডিআইজি হাসিনা রহমান, পুলিশ অধিদফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি ফয়সল মাহমুদ ও কানিজ ফাতেমা, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সুলতানা নাজমা হোসেন, নৌপুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি জেসমিন বেগম, টিডিএস ঢাকার পুলিশ সুপার আবদুর রহিম শাহ চৌধুরী, সিআইডির ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) ফরিদা ইয়াসমিন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা বিধি অনুযায়ী অবসরজনিত সব সুবিধা পাবেন।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে তিন নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে ২০১৮ সালে তাকে জোরপূর্বক বের করে দেয়ার ঘটনায় তারা জড়িত ছিলেন।

এ বিষয়ে তদন্তকারী একটি সূত্র জানিয়েছে, এ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বেশির ভাগ কর্মকর্তাকেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক বা সুবিধাভোগী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা পদোন্নতি ও সুবিধাজনক পোস্টিং পেতে নিজেদের পদবি ব্যবহার করেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, হয়রানি, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে।

অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা এবং জেসমিন বেগমের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে জোর করে বের করে দেয়ার ঘটনায় অংশ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়ার পর আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়ির ভেতরে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়াও ২০১৫ সালের ১০ জুন থেকে ২০২২ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত ডিএমপিতে কর্মরত থাকার সময় তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মিলে বিরোধী দলকে দমনে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া রেবেকা সুলতানার বিরুদ্ধে গোপন রাষ্ট্রীয় তথ্য পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেও জানা গেছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহীল বাকীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পুলিশ সদর দফতরের গোপন শাখায় থাকার সময় টেলিফোনে আড়ি পেতে বিরোধী দলের নেতা ও কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ করে তা পাচার করতেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন ও বিধান ত্রিপুরার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দমন-পীড়নে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। মানিকগঞ্জের তৎকালীন এসপি বিধান ত্রিপুরার বিরুদ্ধে সে সময় নির্বাচনে কারসাজি করতে সহায়তা করা এবং পুরস্কার হিসেবে পুলিশের পদক নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অতিরিক্ত ডিআইজি সোহেলী ফেরদৌস ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট কারসাজিতে জড়িতদের সহায়তা করতে পুলিশ সদর দফতরের কন্ট্রোল রুম থেকে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। নথিতে আরো বলা হয়েছে, সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন- যা একটি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার, আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে।

কক্সবাজারের সাবেক এসপি ও অতিরিক্ত ডিআইজি এ কে এম ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারে যুক্ত থাকা এবং নিজের গাড়িতে করে ইয়াবার চালান পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

ডিআইজি মো: ওয়ালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ডিএমপিতে দায়িত্ব পালনের সময় বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং পিরোজপুরের এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

এসপি আবদুর রহিম শাহ চৌধুরী একটি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরো কয়েকজন কর্মকর্তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাবাদী বা পেশাগতভাবে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, মো: হাবিবুর রহমান এবং ফয়সাল মাহমুদসহ আবদুর রহিম শাহ চৌধুরীকে ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ২০০২ সালের ১ জুলাই চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তারা আরো জানান, ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে জড়িত ছিলেন; কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি পেতে নিজেকে ছাত্রলীগের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি হাসিনা রহমান, কানিজ ফাতেমা এবং সুলতানা নাজমা হোসেনের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংযোগ থাকা এসব কর্মকর্তা কী কী পদক পেয়েছেন এবং সরকারি খরচে কবে কোথায় বিদেশ সফর করেছেন, তার একটি তালিকাও দেয়া হয়েছে।