জ্বালানি তেল, কর কাঠামো এবং ভর্তুকি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেয়া কঠিন শর্তগুলো পুরোপুরি না মানার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঋণের শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে জনগণের ওপর বাড়তি চাপের বোঝা চাপাতে চায় না বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার। মূলত জনস্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এমন কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএমএফের কাছ থেকে ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তির বিপরীতে যেসব শর্ত গ্রহণ করা হয়েছিল, তার অনেকগুলোই বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার মনে করে, অনির্বাচিত সরকারের চাপিয়ে দেয়া শর্তগুলো হুবহু পালন করলে জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
আইএমএফের মূল শর্তগুলো
আইএমএফের ঋণের শর্তানুযায়ী প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল : আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতি মাসে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করা। বিভিন্ন খাতে দেয়া কর রেয়াত (ঞধী ঊীবসঢ়ঃরড়হং) সম্পূর্ণ তুলে নেয়া। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের (ঠঅঞ) একক হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা। বিদ্যুৎ ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা।
সরকারের অবস্থান ও কৌশল
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের শর্ত মেনে ইতঃপূর্বে জ্বালানি তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে আপাতত বিদ্যুতের দাম আর বাড়ানো হবে না। এ ছাড়া ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশ করার দাবিও নাকচ করে দিয়েছে সরকার। ফলে আগামী অর্থবছরেও খাতভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাট হার বহাল থাকবে।
কর রেয়াতের বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত হলো-আগামী বাজেটে কিছু ক্ষেত্রে রেয়াত সুবিধা কমানো হলেও তা পুরোপুরি বাতিল করা হবে না। বিশেষ করে কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় তা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে উচ্চপর্যায়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে আইএমএফের ঋণ চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে না যা সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ীদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে দেশে ফিরে গত ১৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। তাই জনগণের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো কঠিন শর্ত মেনে নেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী অনির্বাচিত সরকারের গৃহীত কর্মসূচির সব শর্ত বর্তমান সরকার মেনে নিতে বাধ্য নয়।
ঋণ কর্মসূচির বর্তমান চিত্র
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের সাথে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঋণের আকার বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে এবং বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার।
আইএমএফ জানিয়েছিল, নির্বাচিত সরকারের সাথেই তারা পরবর্তী কিস্তি নিয়ে আলোচনা করবে। তবে শর্ত পরিপালনে বাংলাদেশের অনড় অবস্থানের কারণে সংস্থাটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চলতি অর্থবছরে ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করা হচ্ছে না। এমনকি আগামী অর্থবছরের কিস্তি ছাড়ের বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত আশ্বাস পাওয়া যায়নি।



