নয়া দিগন্ত ডেস্ক
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সাথে লড়াইরত বাংলাদেশ একটি নতুন সহায়তা কর্মসূচির জন্য অনুরোধ করেছে। বাংলাদেশে আইএমএফের মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার মঙ্গলবার ঘোষণা করেন যে, ‘দীর্ঘস্থায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করা এবং শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার প্রচেষ্টায় আইএমএফ বাংলাদেশের একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে রয়েছে।’
তবে উভয় পক্ষই অনুরোধকৃত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের আকার বা সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী প্রকাশ করেনি। ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
জ্বালানি সঙ্কট
১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। গ্রীষ্মকালে যখন শীতলীকরণের প্রয়োজন হয়, তখন এর চাহিদা বিশেষভাবে বেড়ে যায়। এই আমদানির একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। জ্বালানি খরচ কমাতে ঢাকা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বেশির ভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা। ১৯ এপ্রিল, বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ০.৯৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.১০ ডলার করা হয়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দামও বেড়েছে।
পোশাক শিল্প
তৈরী পোশাক শিল্প, যা বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলো তাদের কাঁচামালের একটি বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করে। চালানগুলো লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পাঠানো হয়, তাই সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচল বিঘিœত হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। কাপড় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ডেনিমের পরিচালক সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশের সংবাদপত্র দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, তিনি আশা করছেন আগামী মৌসুমে কাজের অর্ডার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যাবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসে বেশ কয়েকটি বিমান সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করে। ফলে জারার মালিক ইন্ডিটেক্স এবং অন্যান্য প্রধান পোশাক খুচরা বিক্রেতাদের জন্য নির্ধারিত পোশাকের চালানগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়ে।
কাঁচামালের মূল্য
সরবরাহ শৃঙ্খলে এই বিঘœ বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পকেও প্রভাবিত করেছে। প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দামও বেড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার কারণে রেজিনের দাম বেড়েছে, যা অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি হয় এবং প্লাস্টিকের একটি প্রধান কাঁচামাল। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার পত্রিকা জানিয়েছে যে, যে রেজিনের দাম আগে প্রতি টন প্রায় ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলার ছিল, তা এখন প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের ব্যয়
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন এবং লেনদেনের ভারসাম্য শক্তিশালী করার জন্য সরকার আরো বেশি ঋণ নেয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে। এর ফলে দেশটি একটি মাঝারি কিন্তু ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের উচ্চতর চাপের সম্মুখীন হয়েছে। লন্ডনভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসআইর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পূর্ববর্তী ত্রৈমাসিকের ১১২.২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেড়ে ১১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ সঙ্কটের স্বল্প ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল, কারণ দেশটির ঋণের বোঝা মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ ছিল। ইরান যুদ্ধের পরিণতির প্রভাব বাড়তে থাকায় এই চিত্রটি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন?
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আইএমএফের ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচির মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে, যা ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল এবং চার বছর চলার কথা ছিল। সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে উভয় পক্ষ একটি নতুন কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক জানায়, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি ঘাটতির পর ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানি ব্যয় মোকাবেলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য তারা ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করেছে।
এই যুদ্ধ কি বৃহত্তর পরিসরে ঋণ সঙ্কটকে আরো গভীর করছে?
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং মধ্য ইউরোপের দেশগুলো কোভিড-১৯ মহামারী, জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সুদের হারের কারণে বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, শ্রীলঙ্কা বছরের পর বছর ধরে অস্থিতিশীল ঋণ গ্রহণ এবং দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পর ২০২২ সালে আর্থিক পতনের শিকার হয়। ২০২৩ সালে, দেশটি একটি চার বছর মেয়াদি কর্মসূচির অধীনে আইএমএফ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা লাভ করে এবং চীন, ভারত ও জাপানসহ একদল ঋণদাতার সাথে একটি ঋণ পুনর্গঠন চুক্তিতে পৌঁছায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণ তার মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল।
এপ্রিলে, আইএমএফ সতর্ক করে যে ইরান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী ঋণের মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয় যে, গত বছর বিশ্বব্যাপী মোট সরকারি ঋণ বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সতর্ক করা হয় যে এটি ২০২৯ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর পথে রয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের পর আর দেখা যায়নি।



