জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৪ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে ধরা যায়। এদিন সকালেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, হাইকোর্টের দেয়া পূর্বের রায় বহাল রাখে। রায়ে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৩০% সংরক্ষণ পুনর্বহাল রাখা হয় । এর আগের দিন শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দিয়ে রাখে, কোর্টের রায় তাদের পক্ষে না এলে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাবে। যদিও পূর্ণাঙ্গ শুনানির তারিখ পরে নির্ধারিত হবে বলে জানানো হয়, তবে এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। এ রায়ের প্রতিবাদে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে পঁাঁচ ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তারা মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার দাবি পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরে। একইসাথে তারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেয়।
সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রচারণা জোরদার করার জন্য ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ৭ জুলাই (রোববার) থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির আহ্বান জানিয়ে দিনের কর্মসূচি শেষ করেন। তারা এর পাশাপাশি ৬ জুলাই সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাঠানের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ কর্মসূচির আহ্বান জানান।
এদিন বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা মেধার মূল্যায়ন চেয়ে একযোগে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, কুমিল্লা, খুলনাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাবি আদায়ের শপথ নেন। আন্দোলনের কারণে রাজধানীতে তীব্র যানজট দেখা দেয়।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। মিছিল নিয়ে তারা মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের গেট হয়ে ভিসি চত্বর, টিএসসির রাজু ভাস্কর্য ঘুরে শাহবাগে গিয়ে মোড় অবরোধ করেন। বিকেল ৬টা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি শেষে আন্দোলনকারীরা রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে নতুন করে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মাঠে থাকার শপথ নেন। চার দিন ধরে আন্দোলন চললেও সরকারের পক্ষ থেকে তখনও কেউ কেউ যোগাযোগ করেনি।
শিক্ষার্থীদের পক্ষে তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, শুক্রবার সারা দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন-অফলাইনে জনসংযোগ ও সমন্বয়, শনিবার (৭ জুলাই) বেলা ৩টায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং রোববার সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের মাধ্যমে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হবে। শনিবারের বিক্ষোভ থেকে রোববারের মাঠের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়ে দেন তিনি।
তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া হচ্ছে। সারা দেশে ‘কোটা পুনর্বহাল করা চলবে না’ শীর্ষক ফেসবুক গ্রুপে সবাই যুক্ত রয়েছেন। গ্রুপ থেকেই যাবতীয় বিষয় আপডেট দেয়া হচ্ছে। একই নামে টেলিগ্রাম গ্রুপও রয়েছে আন্দোলনকারীদের।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালে নির্বাহী বিভাগ পরিপত্রের মাধ্যমে কোটা বাতিল করল। বিচার বিভাগ দিয়ে কোটা আবার পুনর্বহাল করা হলো। এটা শিক্ষার্থীদের সাথে প্রহসন। এটা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে সমন্বয়হীনতার উদাহরণ। নির্বাহী বিভাগ আদেশ দিচ্ছে তো বিচার বিভাগ বাতিল করছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্তঃস্কন্ধে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক নেই। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করুক- এটাই আমরা চাই।
তৎকালীন বৈবিছাআর অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, ‘আমরা একই প্রশ্নে ভর্তি পরীক্ষা দেবো, একই প্রশ্নে হবে লিখিত এবং ভাইভার মুখোমুখিও হবো। কিন্তু তারা কোটা সুবিধার কারণে একাই শতভাগ সুবিধা পাবে। তাহলে আমরা ধরে নেবো, জন্মই আমার আজন্ম পাপ।
আন্দোলনে যেতে ছাত্রলীগের বাধা : দুপুর ১২টার দিকে কর্মসূচি হওয়ায় সাড়ে এগারটার দিকে হল গেইটে জড়ো হন। শিক্ষার্থী আন্দোলনে যেতে শিক্ষার্থীদের বাধা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা । একাধিক হলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় তারা। সরেজমিন মাস্টারদা সূর্য সেন ও কবি জসিমউদ্দীন হলগেটে তালা দেখা যায়। এ সময় শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলেও শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হলে গিয়ে তালা খুলতে বাধ্য করেন। এর পরও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে আন্দোলনে অংশ নিতে দেয়নি ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। একই দিন বরিশালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে আন্দোলনরত তিন শিক্ষার্থী আহত হন।
ঐদিন সূর্য সেন হলে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী হল ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক রাকিব উল ইসলাম, তৌহিদুজ্জামান অভিসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের বাইরে না যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকজনকে হুমকিও দেন তারা। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের প্রোগ্রামে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল গ্রুপের শিক্ষার্থীদের মধুর ক্যান্টিনে কর্মীদের আনার নির্দেশ দিয়ে মেসেঞ্জারে বার্তা দিতে দেখা যায়।
রায়ে কোটা বহাল রাখার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও সেদিন দেশের প্রায় স্থানেই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা। এতে রাজধানীর সাথে সারা দেশের সংযোগের ব্যাঘাত ঘটে।
সড়ক অবরোধ জবি শিক্ষার্থীদের : ৪ জুলাই দুপুরে মিছিল নিয়ে কয়েকশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের সামনের সড়ক অবরোধ করেন। সেখানে এক ঘণ্টা অবস্থান নেয়ার পর শিক্ষার্থীরা রায়সাহেব মোড় অবরোধ করেন। এ সময় গুলিস্তান ও বাবুবাজার থেকে সদরঘাট ও যাত্রাবাড়ীগামী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে শিক্ষার্থীরা আধা ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। জবি শিক্ষার্থী জসীম উদ্দীন বলেছিলেন, যতদিন আমাদের দাবি না মানা হয়, ততদিন আমরা রাজপথে আছি, থাকব।
আগারগাঁও মোড় অবরোধ শেকৃবি শিক্ষার্থীদের : এদিন দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটকসংলগ্ন আগারগাঁও মোড় অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে মিরপুর-ফার্মগেট এবং মহাখালী-শিশুমেলা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : সেদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক (ডেইরি গেট) সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে বেলা ১টার দিকে অবরোধ তুলে নেন তারা।
চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি মোড় অবরোধ চবি শিক্ষার্থীদের : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে দুই দিকে কয়েক কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি ছেড়ে দিতে দেখা যায়। এর আগে বেলা ১১টায় চবির শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা।
বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শিক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। পরে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করেন তারা। আন্দোলনের শুরু থেকেই বৃষ্টি হানা দেয়। তবে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টা থেকেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে জড়ো হতে থাকেন। সকাল ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
ঢাকা চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ কুবি শিক্ষার্থীদের : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।
বরিশালে ছাত্রলীগের হামলায় আহত ৩ : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক থেকে সরাতে ঘটনাস্থলে যান ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া ও প্রক্টর ড. মো: আব্দুল কাইউম। শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহারে রাজি না হয়ে জানান, দেশব্যাপী চলমান এ আন্দোলন একসাথে প্রত্যাহার হবে। এরপর উপাচার্য ও প্রক্টর চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগের এক নেতা মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে চেষ্টা করলে বাধা দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর ৩০-৪০ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান।
ট্রেন আটকে অবরোধ বাকৃবি শিক্ষার্থীদের : বিভিন্ন হল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরা মুক্তমঞ্চে এসে সমবেত হন। এরপর সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিলটি কে আর মার্কেট হয়ে পুনরায় মুক্ত মঞ্চের সামনে দিয়ে এসে আব্দুল জব্বার মোড়ে শেষ হয়। এ সময় ঢাকা থেকে জামালপুরগামী জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি আসছিল। শিক্ষার্থীরা ট্রেনটি অবরোধ করে। প্রায় দুই ঘণ্টা (বেলা ১টা ১০ মিনিট থেকে ৩টা ১০ মিনিট) ধরে ট্রেনটি আটকে রাখেন তারা।
কুষ্টিয়া-খুলনা সড়ক অবরোধ ইবি শিক্ষার্থীদের : বেলা পৌনে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক ২০ মিনিট অবরোধ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে অবস্থান নেন তারা। এ সময় তারা কোটা সংস্কারসহ চার দফা দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
খুলনা জিরো পয়েন্ট দখল খুবি শিক্ষার্থীদের : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টি উপেক্ষা করে নগরীর জিরো পয়েন্ট অবরোধ করেন। অবরোধের ফলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জিরো পয়েন্টের চারপাশে খুলনা-ঢাকা, খুলনা-যশোর, খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যায়।



