ম্রাউক-ইউ অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের জন্য স্বশাসিত এলাকা গড়া যায়

গোলটেবিল বৈঠকে উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন

Printed Edition
রাজধানীর একটি হোটেলে রোহিঙ্গা সঙ্কট বিষয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন
রাজধানীর একটি হোটেলে রোহিঙ্গা সঙ্কট বিষয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন

ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস) এবং কনফ্লিক্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিআরআরআইসি) যৌথভাবে গত সোমবার ‘শান্তি পরিকল্পনা, সীমান্ত সুরক্ষিতকরণ : রোহিঙ্গা সঙ্কটে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘নিরাপত্তার মাধ্যমে সঙ্ঘাত নিরসন এবং শান্তিতে জ্ঞানের অগ্রগতি’ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়। রাজধানীর হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রধান অতিথি ছিলেন। গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এফএসডিএস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর। এ ছাড়া অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, অধ্যাপক আমেনা মোহসিনসহ বিশিষ্ট গবেষক, নীতি-বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সঙ্কটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করেন এবং ‘ট্র্যাক ১.৫ কূটনীতি’র প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি ‘টু-স্টেট সলিউশন’-এর পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের জন্য ম্রাউক-ইউ অঞ্চলে একটি স্বশাসিত এলাকা নিয়ে ভাবনার পরামর্শ দেন।

প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্যে মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও এই দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট দেশের অর্থনীতি, স্থানীয় সমাজ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে পরিবেশগত ক্ষয়, অপরাধ বৃদ্ধি, সীমান্ত পাচার চক্রের বিস্তার এবং উগ্রবাদী ঝুঁকি বাড়ছে বলে তিনি সতর্ক করেন। বৈঠকে তিনি ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে জাতীয় রোহিঙ্গা কৌশল প্রণয়ন, সমন্বিত নীতি কাঠামো, জাতীয় রোহিঙ্গা রেসপন্স কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ, আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম গঠন এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বৈঠকের সঞ্চালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) শফাত আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় মানবাধিকারভিত্তিক, সমন্বিত ও রাষ্ট্রীয় কৌশল জরুরি। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রতি তিনি জোর দেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব বণ্টনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

সিআরআরআইসির নির্বাহী পরিচালক ড. কাওসার আহমেদ বলেন, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি ও সুস্পষ্ট কৌশল গ্রহণ করতে হবে। দাতাদের অনাগ্রহ এবং শিবিরে অস্থিতিশীলতার কারণে টেকসই সমাধান আরো জরুরি হয়ে উঠেছে। তিনি জধশযরহব জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ চষধহ-এর কথা তুলে ধরে গবেষণাভিত্তিক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান।

সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতকে ভিত্তি করে পাঁচ দফা জধশযরহব জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ চষধহ-এর রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি ফলপ্রসূ না হওয়ায় নতুন কৌশলগত, গবেষণানির্ভর ও বহুমাত্রিক সমন্বয়ের পরামর্শ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমেনা মোহসিন সীমান্ত গবেষণা, বহুমাত্রিক কূটনীতি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর (আসিয়ান, বিমসটেক, সার্ক) সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দেন। তার মতে, মানুষের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ এস এম আলী আশরাফ রোহিঙ্গা সঙ্কটকে বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি ও নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষ দূত নিয়োগ, সমন্বিত কৌশল, ট্র্যাক-২ সম্পৃক্ততা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব দ্য রোহিঙ্গাস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফায় গণহত্যা সঙ্ঘটিত হয়েছে। সঙ্কট এখন মানবিক নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তিনি মিয়ানমার সামরিক বাহিনী, চীন, ভারত ও আসিয়ানের সাথে সমন্বিতভাবে কথা বলার জন্য রোহিঙ্গাদের সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।

বিএনপির আন্তর্জাতিক সেলের সদস্য জেবা আমিনা খান বলেন, আট বছর ধরে চলমান সঙ্কট এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনাও বাড়ছে। তিনি রাকাইন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে ‘টু-স্টেট সলিউশন’-এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস অতীতের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশকে আসিয়ানের সাথে নতুন করে সক্রিয় সম্পৃক্ততা তৈরি করতে হবে। তিনি স্পষ্ট নীতি ঘোষণা, আঞ্চলিক জোট গঠন এবং ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় আলোচনার পথ খোলার আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধি খিন মাউং বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা আরাকান আর্মির আন্তরিকতা নেই- এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। রোহিঙ্গা অধিকার, ভূমি পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।

অতিরিক্ত সচিব ও আরআরআরসি কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তার বক্তব্যে সঠিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংখ্যা ও শিবির-পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করেন। তিনি জানান, ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে রয়েছে এবং পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বাড়ছে। তিনি একটি স্থায়ী জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান জানান।

এফএসডিএস মহাসচিব ড. ইশারাফ হোসেন সমাপনী বক্তব্যে বলেন, আট বছরে সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অভাবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন পক্ষ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করায় সময় ও সম্পদ নষ্ট হয়েছে। তিনি একীভূত, বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রোহিঙ্গা কৌশল গ্রহণের আহ্বান জানান। বিজ্ঞপ্তি।