নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতি, অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং গ্রাহকদের নামে মিথ্যা ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন ২৬টি রফতানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকরা। তাদের দাবি, ব্যাংকের এসব অনিয়মের কারণে কারখানাগুলো মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে এবং ঝুঁকিতে পড়েছে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান।
গতকাল রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান।
এতে অভিযোগ করা হয়, ২০১৭ সাল থেকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করেন। এসব কৃত্রিম কন্ট্রাক্টের বিপরীতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যদিও বাস্তবে কোনো কাঁচামাল আমদানি হয়নি। পরে এসব এলসির দায় নিষ্পত্তির নামে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে উচ্চমূল্যে ডলার কেনা হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারদরের চেয়ে প্রতি ডলারে ১২ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে ডলার কেনার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। একই সাথে রফতানি নথির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চলতি হিসাবে জমা রেখে সেই অর্থ ব্যবহার করে কথিত এলসির দায় পরিশোধ দেখানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক একতরফাভাবে ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন তৈরি করে বিপুল সুদ আরোপ করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, এসব ঋণ গ্রাহকদের পূর্বানুমতি বা নোটিশ ছাড়াই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন লঙ্ঘন করে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণ সৃষ্টি করে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাইলেও ব্যাংক তা দেয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, পুনঃতফসিলের শর্তে স্বাক্ষর না করলে এলসি ও অন্যান্য ঋণ সুবিধা বাতিলের হুমকি দেয়া হতো। এতে কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং শ্রমিকদের বেতন পরিশোধও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ভুক্তভোগীরা আরো অভিযোগ করেন, ব্যাংকের চাপ ও ঋণসংক্রান্ত মানসিক উদ্বেগে দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারা গেছেন। তাদের মধ্যে টোটাল ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনে ৩৭ বার ফোন করে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেয়া হয় বলে দাবি করা হয়। ২৭ ডিসেম্বর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া ওয়েস্ট অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধেও দুদকে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপে ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এ ছাড়া আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্ট্রোক করে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
ব্যবসায়ীরা বলেন, ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ করেই বিপুল অঙ্কের দায় দেখানো হয়, যা তাদের কাছে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। তারা বলেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে ঋণ পরিশোধের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকরা কর্মহীন হবে, অন্য দিকে দেশের রফতানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কারখানা সচল রেখে প্রকৃত দায় পরিশোধের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও স্বনামধন্য অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানানো হয়। এ বিষয়ে গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহরাব বিন হাসিব, জননী ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম পোদ্দারসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।



