বিজিবি-পুলিশের চার কর্মকর্তার বিচার শুরু

রামপুরা-বনশ্রী গণহত্যা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে বিজিবি ও পুলিশের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলার শুনানি পরিচালনা করছেন। অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলার চার আসামির মধ্যে দুইজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তারা হলেন তৎকালীন বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো: রাফাত-বিন-আলম। মামলার অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো: রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মশিউর রহমান বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

অভিযোগের মূল বক্তব্যে আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই রামপুরা, বনশ্রী, আফতাবনগর ও সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের দমনে বিজিবি ও পুলিশ দুই হাজার ৭৭৮ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এর মধ্যে বিজিবি এক হাজার ৭৬ রাউন্ড এবং পুলিশ এক হাজার ৭০২ রাউন্ড মারণাস্ত্রের গুলি ব্যবহার করে।

সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, আজ আমরা স্মরণ করছি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় হাজার শহীদ এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থী-জনতাকে, যারা পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করেছেন। হত্যা ও জখম সম্পর্কিত যে সব উপাদান প্রসিকিউশন আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবে, সেগুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট, স্বচ্ছ এবং অকাট্য প্রমাণ যার ভিত্তিতে এই ট্রাইব্যুনাল ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই; আমরা অপরাধের বিচারের জন্য আপনাদের শরণাপন্ন হয়েছি।

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আজ আমরা যে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে যাচ্ছি, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করবে যে, এই অপরাধগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত ও ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রোধ করা, ভীতি সৃষ্টি করা এবং জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে দমন করা। এসব অপরাধ শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি জাতির স্বপ্ন ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত হেনেছে। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজারো পরিবার চিরতরে ভেঙে গেছে এবং একটি জাতির মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন বর্বর ও নৃশংস ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। জুলাই বিপ্লব চলাকালীন তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডারদের আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে ঢাকা মহানগরীর খিলগাঁও থানাধীন বনশ্রী ও রামপুরা এলাকা ১৮ এবং ১৯ জুলাই ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়। ওই দিন ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় নিরীহ ও নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষকে হত্যা ও অগণিত মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হয় চরম নির্যাতন।

তিনি বলেন, এই মামলার ঘটনা থেকে জানা যায়:

১. বিটিভি ভবনের নিকট মেহেদী আলমকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে মারাত্মক জখম করা হয় এবং গঙ্গাচরণ রাজবংশীকে রামপুরা ব্রিজ সংলগ্ন ওয়াসা লিফটিং স্টেশনের সামনের রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

২. ঢাকা মহানগরের রামপুরা এবং হাতিরঝিল থানাধীন ডিআইটি রোডস্থ ১ নং পূর্ব রামপুরা বেটার লাইফ হাসপাতালের সামনের রাস্তা, ওয়াপদা রোডের মুখ এবং রামপুরা বাজার সংলগ্ন রাস্তায় মো: মামুন মিয়াসহ ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং মো: কাওসার হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে মারাত্মক জখম করা হয়।

৩. ঢাকা মহানগরের হাতিরঝিল থানাধীন ডিআইটি রোডস্থ ডেল্টা কেয়ার হাসপাতাল, মাল্টি কেয়ার হাসপাতাল, মোল্লা টাওয়ারের সামনের রাস্তা, একরামুন্নেসা স্কুলের গলি এবং মক্কি মসজিদ গলিতে মো: মোস্তফা জামান সমুদ্রসহ ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং লিয়াকত হোসেনসহ পাঁচজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে মারাত্মকভাবে জখম করা হয়।

৪. ঢাকা মহানগরের বাড্ডা থানাধীন আফতাবনগর জহুরুল ইসলাম সিটির প্রবেশমুখের রাস্তায় মো: রাকিব হোসেনকে (২৩) গুলি করে হত্যা এবং ভিকটিম মো: উজ্জ্বল হোসেনকে (২৮) হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে মারাত্মকভাবে জখম করা হয়।

৫. ঢাকা মহানগরের বাড্ডা থানাধীন প্রগতি সরণি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মেইন রাস্তায় তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ (৩৪) দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

৬. ঢাকা মহানগরের বনশ্রী আবাসিক এলাকায় (রামপুরা ও খিলগাঁও থানা এলাকা) রাসেল মিয়াসহ (৩২) ১২ জনকে গুলি করে হত্যা এবং ভিকটিম মাসুম আহমেদসহ আটজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে মারাত্মকভাবে জখম করা হয়।

আন্দোলনকারী নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই উল্লিখিত আক্রমণ পরিচালিত হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে ওই দুই দিনে বিজিবি সংশ্লিষ্ট এলাকায় এসএমজি ও চাইনিজ রাইফেল থেকে এক হাজার ৭৬ রাউন্ড এবং পুলিশ এক হাজার দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। যার ফলে উল্লিখিত হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে।

আসামিরা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত না থেকে শুধুমাত্র শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অধীনস্থদের দ্বারা ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশব্যাপী ব্যাপক মাত্রায় এবং পদ্ধতিগতভাবে (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক অপরাধ সংঘটন করেছেন বা করিয়েছেন, যার অংশ ছিল বর্ণিত অপরাধসমূহ।

প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী এই হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হন, যার মধ্যে মস্তফা জামান সমুদ্র (১৭), মো: মামুন মিয়া (২৬) এবং গঙ্গাচরণ রাজবংশীসহ আরো অনেকে রয়েছেন। এই মামলায় মোট ১০৩ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা বিজিবি ও ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের সাক্ষী রয়েছেন। প্রসিকিউশন দাবি করেছে, ডিজিটাল রেকর্ড ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে তারা এই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।

বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই বিচার একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে প্রসিকিউশন আশা প্রকাশ করেছে।

প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী

জবানবন্দীতে বিশ্বজিৎ রাজবংশী বলেন, তিনি পেশায় একজন এসি মেকানিক। তার বাবা গংগাচরণ রাজবংশী ছিলেন জাদুশিল্পী শাহিন শাহর ব্যক্তিগত গাড়ি চালক। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সারা দেশে আন্দোলন চলছিল। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে আমার বড় ভাই মিঠু রাজবংশীর ফোনে আমার বাবার ফোন থেকে একটি ফোন আসে। একজন অপরিচিত ব্যক্তি আমার বাবার ফোন থেকে আমার বড় ভাইকে বলেন, এই ফোনের মালিক আপনার কি হয়। আমার বড় ভাই বলেন তিনি আমার বাবা হন। তখন ওই ব্যক্তি বড় ভাইকে বলেন, আপনার বাবাকে বিজিবি গুলি করেছে, রামপুরা ব্রিজের পরে ওয়াসা গেইটের সামনে তিনি পড়ে আছেন, ওনার অবস্থা বেশি ভালো না, আপনারা তাড়াতাড়ি আসেন। আমার বড় ভাই অসুস্থ থাকার কারণে আমি, আমার মা এবং এলাকার দুই-তিনজন পরিচিত লোক নিয়ে বাবাকে আনার জন্য রওনা হই। রাস্তায় রিকশা না পেয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পিছন দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে উপস্থিত কিছু লোক আমাদেরকে বলেন, ওদিকে যাবেন না, বিজিবি গুলি করছে, মারা যাবেন। আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে আফতাব নগরের গেইটে আসলে কিছু বিজিবি এবং পুলিশ আমাদেরকে আটকায়। আমি এবং আমার মা বলি আমার বাবা অসুস্থ, আমরা তাকে আনতে যাচ্ছি। তখন বিজিবি এবং পুলিশ আমাদেরকে হাত উঁচিয়ে যেতে বলেন। আমরা রামপুরা ব্রিজের পরে ওয়াসা গেইটের সামনে গিয়ে দেখতে পাই ১৪-১৫ বছরের একটি ছেলে আমার বাবার ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং আমার বাবা পাশে পড়ে আছেন। ওই ছেলেটি আমাকে বাবার ফোনটি দেয় এবং জানায় যে, আমার বাবাকে বিজিবি গুলি করেছে। আমি আমার বাবার গায়ে হাত দেই এবং ডাকি কিন্তু কোনো সাড়া পাই নাই এবং দেখতে পাই আমার বাবার বুকের ডানপাশে একটি গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। আমরা বুঝতে পারি আমার বাবা আর বেঁচে নেই। আমি এবং আমার মা অনেক কান্নাকাটি করি। সেখানে চারদিকে অন্ধকার, ধোঁয়াচ্ছন্ন এবং গ্যাসের গন্ধ ছিল। এ সময় একটি পায়ে চালিত ভ্যান দেখতে পাই। আমরা অনেক অনুরোধ করে ভ্যান চালককে রাজি করিয়ে আনুমানিক রাত সারে ১১টার দিকে আমার বাবার লাশ ভ্যানে করে বাড়িতে নিয়ে আসি।

এর পর আমি ওই রাতেই প্রথমে বাড্ডা থানায় যাই এবং পরে রামপুরা থানায় যাই বাবার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অবগত করতে। কিন্তু আমাকে থানায় ঢুকতে না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। আমি বাসায় ফিরে আসি।

পর দিন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমার বাবার দেহ সৎকারের জন্য সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে পোস্তগোলা শ্মসানঘাটে পৌঁছাই এবং আনুমানিক ২টা ৩০ থেকে ৩টার মধ্যে বাবার সৎকার সম্পন্ন হয়।

কয়েক দিন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। ইন্টারনেট পুনরায় চালু হলে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে বিজিবি ও পুলিশের কিছু সদস্য ঊর্ধ্বতন কারো নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাই যে, বিজিবির অফিসার রেদোয়ান ও রাফাত, পুলিশের রামপুরা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান এবং খিলগাঁও জোনের এডিসি রাশেদুল এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।