হাবিবুল বাশার
রাজধানীর যান্ত্রিক জীবনে মেট্রোরেল এখন এক পশলা বৃষ্টির মতো স্বস্তি। যানজটের শহর ঢাকায় মতিঝিল থেকে উত্তরা মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে গন্তব্যে। কিন্তু এই গতির আড়ালে রমজান মাসে এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে অফিস ফেরত করপোরেট কর্মীদের জন্য ইফতারের সময়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে সময়ের সাথে এক অসম লড়াই। যেখানে পকেটে অর্থ থাকলেও জোটে না সামান্য ইফতারি, যেখানে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় বিসর্জন দিতে হয় তৃপ্তির ইফতার।
জনস্রোত ও মেট্রো স্টেশনের বাস্তবতা
সরকারি তথ্য এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (উগঞঈখ)-এর নিয়মিত পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন গড়ে তিন লক্ষাধিক মানুষ এখন মেট্রোরেলে যাতায়াত করছেন। বিশেষ করে রমজান মাসে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় ‘সুপার পিক আওয়ার’এ উঠে যায়। সচিবালয়, মতিঝিল ও কাওরানবাজারের মতো বাণিজ্যিক এলাকাগুলো থেকে অফিস শেষে যখন জনস্রোত স্টেশনে আছড়ে পড়ে, তখন তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না।
স্টেশন সূত্রের খবর অনুযায়ী, প্রতিদিন ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে প্রায় ৬০ হাজারেরও বেশি যাত্রী সরাসরি ট্রেনের বগিতে অথবা প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করেন। গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছে পরিবারের সাথে ইফতার করার অদম্য ইচ্ছা থাকলেও, অধিকাংশেরই সেই সুযোগ হয়ে ওঠে না। ট্রেনের ভেতরেই বেজে ওঠে মাগরিবের আজান।
করপোরেট জীবনের এক ‘সাদামাটা’ ইফতার
মেট্রোরেলের ভেতরে খাবার গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও রমজান মাসে কর্তৃপক্ষ মানবিক কারণে পানির বোতল ও খেজুর সাথে রাখার অনুমতি দেয়। তবে সেই ইফতারের দৃশ্যটি অত্যন্ত সাধারণ এবং অনেক ক্ষেত্রে বেদনাদায়ক। সরেজমিন দেখা যায়, ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় যখন আজান দেয়, তখন যাত্রীরা একে অপরের দিকে পানির বোতল বাড়িয়ে দেন।
আলাপকালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন জানান, ‘আমরা যারা করপোরেট চাকরি করি, আমাদের আর্থিক সক্ষমতা হয়তো আছে; কিন্তু সময় নেই। অফিস থেকে বের হতে হতে ইফতারের সময় হয়ে যায়। স্টেশনে বা ট্রেনের ভেতর ইফতারি কেনার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই পকেটে থাকা এক বোতল পানি আর দুইটা খেজুরই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। বেশর ভাগ সময় তৃষ্ণা মেটানো গেলেও ক্ষুধা মেটে না।
অভাব নেই অর্থের, অভাব শুধু সুযোগের
স্টেশনের ভেতরে কোনো ফুড কিয়স্ক বা অস্থায়ী দোকান না থাকায় যাত্রীরা নিরুপায়। পাশের এক যাত্রী আক্ষেপ করে বললেন, পকেটে টাকা আছে; কিন্তু স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কি এক প্যাকেট ইফতার বা একটা স্যান্ডউইচ পাওয়ার জো আছে? পাশের ভাই পকেট থেকে একটা খেজুর দিলেন, তাই খেয়ে রোজা ভাঙলাম।
এই যাত্রীদের দাবি, রমজান উপলক্ষে অন্তত মতিঝিল, শাহবাগ বা মিরপুর-১০ এর মতো বড় স্টেশনগুলোতে অস্থায়ী ছোট বুথ থাকা উচিত। যেখানে রোজাদাররা চটজলদি স্বাস্থ্যসম্মত ইফতারি কিনে ট্রেনে উঠতে পারেন। এতে করে রোজা ভাঙার মুহূর্তে তাদের এই অসহায়ত্ব ঘুচত।
ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ
এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেট্রোরেল যেন এক মানবিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। আজানের সাথে সাথে যখন কেউ পানির বোতল খোলেন, তখন তিনি একা খান না। পাশের রোজাদার যাত্রীটির দিকেও বাড়িয়ে দেন। কেউ হয়তো বাসা থেকে আনা খেজুরের প্যাকেটটি সবার সামনে ধরেন। টাকা বা সামাজিক মর্যাদা তখন গৌণ হয়ে যায়, মুখ্য হয়ে ওঠে সহমর্মিতা। এই দৃশ্যগুলোই যেন মেট্রোর যান্ত্রিকতাকে ছাপিয়ে এক টুকরো মানবিকতার গল্প শোনায়।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ রাজধানীবাসীকে যানজটমুক্ত দ্রুত গন্তব্যের নিশ্চয়তা দিয়ে সফল হয়েছে। কিন্তু রমজান মাসে এই বিশাল যাত্রীগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও শারীরিক চাহিদার বিষয়টিও মানবিক দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন। যাত্রীদের দাবি অনুযায়ী, স্টেশনগুলোতে যদি সীমিত পরিসরে হলেও ইফতারসামগ্রী বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়, তবে হাজার হাজার রোজাদার যাত্রী শান্তিতে রোজা ভাঙতে পারবেন।
দিনের শেষে ট্রেনের জানালা দিয়ে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তখন ঘরে ফেরা এই মানুষগুলোর মনে কেবল একটাই চাওয়া থাকে পরিবারের কাছে পৌঁছে তৃপ্তির সাথে দিনান্তের ক্লান্তি দূর করা। কিন্তু মেট্রোর এই ‘এক চুমুক পানির ইফতার’ যেন করপোরেট জীবনের যান্ত্রিকতার এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


