২৬ মার্চ ১৯৭১ : জাতির আত্মপ্রকাশের নির্ণায়ক মুহূর্ত ; মেজর অব. মো. আখতারুজ্জামান

প্রাচীন বঙ্গ থেকে বাংলাদেশ : ইতিহাস, রাষ্ট্র, মানুষ ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ ধারাবাহিক যাত্রা

Printed Edition

প্রাচীন বঙ্গ থেকে আধুনিক বাংলাদেশ- এই ইতিহাস কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল নয়; বরং হাজার বছরের সভ্যতা, সংস্কৃতি, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিক বিকাশের একটি সুসংগঠিত পরিণতি। এই ভূ-খণ্ডের মানুষের ভাষা, বিশ্বাস, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক চেতনা যুগে যুগে পরিবর্তিত হলেও একটি মৌলিক ধারাবাহিকতা অটুট থেকেছে- নিজস্ব পরিচয় রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার এক নির্ণায়ক মুহূর্ত, যেখানে একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্বকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার পথে আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্রসর হয়। এই যাত্রাকে বুঝতে হলে এটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার ধারাবাহিকতা হিসেবে নয়; বরং একটি সভ্যতার বিবর্তন হিসেবে দেখতে হয়- যেখানে প্রতিটি যুগ পরবর্তী যুগের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

প্রাচীন বঙ্গ ছিল একটি স্বতন্ত্র সভ্যতাগত পরিসর, যার মূল ভিত্তি ছিল নদীমাতৃক ভূগোল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার উর্বরতা স্থায়ী বসতি ও কৃষিনির্ভর সমাজ গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করে। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০-১৫০০ সময়ে অস্ট্রোএশীয় জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং কৃষি, মৎস্য আহরণ ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলে। এই সমাজ প্রকৃতিনির্ভর হলেও ধীরে ধীরে সংগঠিত ও অভিযোজনশীল হয়ে ওঠে। প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে ওয়ারী-বটেশ্বর (নারায়ণগঞ্জ) ও মহাস্থানগড় (বগুড়া)-এর মতো স্থানে প্রাচীন নগরায়ণ, বাণিজ্যকেন্দ্র ও মুদ্রা ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়, যা নির্দেশ করে যে বঙ্গ কেবল একটি কৃষিভিত্তিক অঞ্চল ছিল না; বরং এটি প্রাচীন বিশ্বের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

এই সময়ের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বঙ্গের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে হজরত ইবরাহিম আ:-এর সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামো গড়ে উঠছিল, একই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষিনির্ভর সমাজ ও আঞ্চলিক সভ্যতার ভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছিল। অর্থাৎ, বঙ্গের প্রাথমিক মানবসমাজ গঠন বিশ্ব সভ্যতার বৃহত্তর সময়রেখার সঙ্গে সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রাচীন ও প্রাক-মধ্যযুগীয় সময়ে বঙ্গ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। নদীপথ ও সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন এবং রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চলত। ‘ইন্ডিয়ান ওশান ট্রেড নেটওয়ার্ক’-এর অংশ হিসেবে বঙ্গের বন্দরগুলো থেকে মসলা, বস্ত্র, মুক্তা ও ধাতু রফতানি হতো এবং বিদেশি পণ্য আমদানি করা হতো। রোমান স্বর্ণমুদ্রা, চীনা মৃৎপাত্র এবং আরব বণিকদের বিবরণ এই বৈশ্বিক সংযোগের স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। অর্থাৎ, বঙ্গ প্রাচীনকাল থেকেই একটি গ্লোবাল সংযোগভিত্তিক সভ্যতা ছিল- যেখানে নদী ও সমুদ্র অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গঙ্গারিডাই রাষ্ট্রের উত্থান বঙ্গের রাজনৈতিক শক্তির প্রথম সুস্পষ্ট নিদর্শন। গ্রিক ঐতিহাসিক মেগাস্থেনিস ও ডায়োডোরাস এই অঞ্চলের শক্তিশালী সেনাবাহিনী, বিশেষ করে যুদ্ধহস্তীর উল্লেখ করেছেন। এরপর মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মাধ্যমে বঙ্গ একটি বৃহৎ কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।

সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮-২৩২), যিনি কলিঙ্গ যুদ্ধের পর বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন, তার শাসনামলে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়-যার প্রভাব বঙ্গসহ সমগ্র অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে (৩২০-৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ) উপমহাদেশে সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের এক নতুন যুগ শুরু হয়। আর্যভট্টের গণিত, কালিদাসের সাহিত্য এবং শিল্পকলার বিকাশ এই সময়কে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে পরিচিত করে। বঙ্গ এই সাংস্কৃতিক ধারার অংশীদার হয় এবং ধর্মীয় বহুত্ববাদ বজায় রেখেই হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক গৌড়কে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলার আঞ্চলিক রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সূচনা নির্দেশ করে।

পরবর্তীতে পাল সাম্রাজ্য (৭৫০-১১৭৪) বাংলাকে বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করে। ধর্মপাল ও দেবপালের সময়ে সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এটি কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; বরং একটি বিশ্বমানের জ্ঞানকেন্দ্র ছিল, যেখানে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আগমন করত। এই সময়ে বঙ্গ একটি বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর সেন রাজবংশ (১০৯৭-১২০৪) বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করে। বল্লাল সেন কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে সমাজকে কঠোর শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত করেন। ব্রাহ্মণদের মধ্যে উচ্চ-নীচ শ্রেণিবিন্যাস এবং বিবাহে কঠোর নিয়ম চালু হয়, যা সমাজে এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সৃষ্টি করে। লক্ষ্মণ সেনের সময় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ হলেও সামাজিক গতিশীলতা কমে যায় এবং কাঠামো আরো কঠোর হয়।

এই সামাজিক কঠোরতা ও রাজনৈতিক দুর্বলতার সম্মিলিত প্রেক্ষাপটেই ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির অভিযান সংঘটিত হয়- যা বাংলার ক্ষমতার কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করে।

মধ্যযুগীয় বঙ্গ : সমৃদ্ধি, শক্তি ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়

১৩ থেকে ১৮ শ’ শতাব্দীর মধ্যে বঙ্গ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চলে পরিণত হয়। এই সময়ে ইসলামের আগমন বঙ্গে একটি ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রায় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে আরব মুসলিম বণিকরা বঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষত চট্টগ্রাম ও সমুদ্রবন্দর এলাকায় আগমন করে এবং বাণিজ্য, বসতি ও সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে ইসলামের প্রাথমিক পরিচয় ঘটায়। এই পর্যায়ে ইসলাম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও যোগাযোগের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীকালে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলায় প্রবেশ করে উত্তর বঙ্গের লখনৌতি অঞ্চল দখল করেন, যার মাধ্যমে বঙ্গে মুসলিম শাসনের সূচনা ঘটে। এরপর সুফি সাধক ও পীরগণ ১৩ থেকে ১৬ শ’ শতাব্দীর মধ্যে গ্রামীণ সমাজে ইসলামের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিস্তার ঘটান। এই বিস্তার জোরপূর্বক ছিল না বরং মানুষের গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া। এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বঙ্গ সালতানাতের উত্থান ঘটে, যা একটি বহুমাত্রিক ও সহাবস্থানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলে।

১৫৭৬ সালে সম্রাট আকবরের শাসনামলে তার সেনাপতি মান সিংহের নেতৃত্বে রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বঙ্গ সালতানাতের অবসান ঘটে এবং বঙ্গ অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে আসে। মুঘল শাসনামলে বঙ্গ আরো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং ঢাকা মসলিন উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে।

বঙ্গ তখন কেবল টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করেনি; বরং বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও কারুশিল্পে নেতৃত্ব দিয়েছে।

ঔপনিবেশিক যুগ : শোষণ ও জাগরণ

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়। নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোর অবসান ঘটে এবং ধীরে ধীরে একটি শোষণমূলক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে দেশীয় অর্থনীতি, শিল্প এবং সমাজব্যবস্থায় গভীর পরিবর্তন আসে-দেশীয় শিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, কৃষকরা নতুন করব্যবস্থার চাপে পড়ে এবং সম্পদের প্রবাহ ঔপনিবেশিক শক্তির দিকে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। এই শোষণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ফারায়েজি আন্দোলন ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকসমাজকে সংগঠিত করে। তিতুমীর (১৮৩১) ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তোলেন, যা গ্রামীণ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে বাংলার অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও ঢাকায় প্রতিরোধ ও দমন উভয়ই দেখা যায়- যা উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের ইঙ্গিত বহন করে।

অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার চরম প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; বরং ছিল শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতির নির্মম ফলাফল। তবে এই অন্ধকার সময়েই বাঙালির মধ্যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়। নীলবিদ্রোহ কৃষকদের সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা করে, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সমাজকে নতুন চিন্তার দিকে নিয়ে যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্ব বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করে তোলেন। ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হয়- যা পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে।

এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বঙ্গ শিখে যায়- অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম অনিবার্য।

পাকিস্তান পর্ব : বৈষম্য ও প্রতিরোধ

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়। মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ- বিশেষত এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী- একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র কাঠামো পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে বাঙালির মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। মওলানা ভাসানী কৃষকভিত্তিক রাজনীতি গড়ে তোলেন। পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হয়- পাট রফতানির অর্থ পশ্চিমে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন থেকে আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম শুরু হয়ে ১৯৬৬ ছয় দফায় রাজনৈতিক কাঠামো পায়, ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থানে জনশক্তির বিস্ফোরণ ঘটে এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

মার্চ ১৯৭১ : সঙ্কট, কৌশল ও স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে

১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সঙ্কট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যার সূত্রপাত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে। সাংবিধানিকভাবে সরকার গঠনের অধিকার থাকা সত্ত্বেও ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পশ্চিম পাকিস্তান ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা দেখায়। সঙ্কটের মূল ছিল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট অস্বীকার। ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশাসন কার্যত বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং পূর্বপাকিস্তান এক ধরনের ফব ভধপঃড় স্বশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়।

৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার লক্ষ্য স্পষ্ট করেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তবে তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। এর পেছনে ছিল বাস্তবতা- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখনো সক্রিয়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অনিশ্চিত এবং তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বিদ্যমান। একই সময়ে পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং জনসমর্থনের ঘাটতি স্পষ্ট হচ্ছিল।

৭ মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত একটি ঘোষণাবিহীন স্বশাসিত অবস্থা তৈরি হয়। তবে সামরিক ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কারণে চূড়ান্ত ফল তখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে ৭ মার্চ ছিল একটি সময়ের বাঁক কিন্তু শেষ নয়। এই অস্থির অবস্থার অবসান ঘটে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে, যা রাজনৈতিক সঙ্কটকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপান্তরিত করে।

পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট মূলত একটি রাষ্ট্রের ভেতরে গণতান্ত্রিক বৈধতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সংঘর্ষে পরিণত হয়।

২৫-২৬ মার্চ : আত্মপ্রকাশ

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, অষ্টমসহ বিভিন্ন ইউনিটের অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড, নন-কমিশন্ড ও সৈনিকরা বিদ্রোহে অংশ নেন। তাতে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী, প্রবাসী- সবাই যুক্ত হন। চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান- অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং সেখানে অবস্থানরত জ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা কর্মকর্তা- নিজ জীবন ও ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পুনঃপ্রচার করেন। ২৫-২৬ মার্চ ছিল একটি জাতির আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত- যেখানে রাজনৈতিক আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের জন্ম একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল। ২৬ মার্চ ছিল সেই নির্ণায়ক মুহূর্ত।

বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়নি এটি ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে অর্জিত এক অবিচ্ছিন্ন জাতীয় জাগরণের ফল।