আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন চমক হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’। দেশের তরুণদের মেধা, উদ্ভাবন এবং ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে এই প্রথম বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে এই খাতের জন্য প্রাথমিকভাবে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল বা থোক বরাদ্দ রাখা হতে পারে। একই সাথে এই অর্থনীতির রূপরেখা ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি নির্দেশিকা (বই) তৈরির কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, চলচ্চিত্র, গেমিং, ডিজাইন এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক শিল্পকে কেন্দ্র করে এই নতুন অর্থনৈতিক কৌশল সাজাচ্ছে সরকার।
প্রান্তিক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন : অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী
এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দেশের অর্থনীতিকে প্রকৃত অর্থেই গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে বাজেটের মূলধারার বাইরে থাকা কামার, কুমার, তাঁতীসহ আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি থিয়েটার, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও কৃত্রিম গয়নার মতো সৃজনশীল খাতের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে আগামী বাজেটে বিশেষ প্রকল্প ও প্রণোদনা তহবিল রাখা হবে। এমনকি ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে বিশেষ ‘থিয়েটার জেলা’ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।”
বাজেটে যা থাকছে : নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ
অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, গ্রাফিক ডিজাইন, চলচ্চিত্র, ডিজিটাল মিডিয়া, অ্যানিমেশন, গেমিং, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন খাতের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে বাজেটে বেশ কিছু প্রস্তাবনা থাকছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য :
রফতানি ও নগদ সহায়তা : সৃজনশীল পণ্য ও ডিজিটাল সেবা বিদেশে রফতানির বিপরীতে বিশেষ নগদ প্রণোদনা।
সহজ শর্তে ঋণ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল : তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপের জন্য স্বল্পসুদে জামানতবিহীন ঋণ এবং সরকারি উদ্যোগে বিশেষ ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল’ গঠন।
ইনোভেশন জোন ও ক্রিয়েটিভ হাব : দেশের প্রধান জেলাগুলোতে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের সুবিধার্থে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা ‘ইনোভেশন জোন’ স্থাপন।
দক্ষতা উন্নয়ন : বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে সৃজনশীল কারিকুলাম তৈরি এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া’ সহযোগিতা বৃদ্ধি।
বৈশ্বিক চিত্র : ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃজনশীল শিল্প একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্যমতে, বিশ্বে সৃজনশীল অর্থনীতির বার্ষিক আয় বর্তমানে ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের সাথে যুক্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান চোখ কপালে তোলার মতো: যুক্তরাষ্ট্র : ৪.২ শতাংশ; ফিলিপাইন : ৭.৩৪ শতাংশ; ইন্দোনেশিয়া : ৭.২৮ শতাংশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি তাদের মেধা ও সংস্কৃতিকে জিডিপির ৭ শতাংশে রূপান্তর করতে পারে, তবে বাংলাদেশের তরুণ ও সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মাধ্যমে এখানেও এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কেন বাংলাদেশের জন্য ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ গেম-চেইঞ্জার?
সৃজনশীল অর্থনীতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনী দক্ষতাকে সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি গেম-চেইঞ্জার হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:
১. প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কম চাপ : এই অর্থনীতির অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর না করে উচ্চ ‘মূল্য সংযোজন’ করতে সক্ষম। এর প্রধান কাঁচামাল হলো মানুষের মগজ বা মেধা।
২. তরুণ ও নারী কর্মসংস্থান : বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ জনগোষ্ঠী বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও নির্মাণ ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। এই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সুযোগও সবচেয়ে বেশি।
৩. লোকশিল্পের আন্তর্জাতিকীকরণ : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি, মৃৎশিল্প বা হস্তশিল্পের বিশ্ববাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এগুলো সরাসরি বিশ্বমঞ্চে বিপণন করা সম্ভব।
প্রধান চ্যালেঞ্জ : কপিরাইট ও অর্থায়ন
বাজেটে বরাদ্দ এবং সরকারের এই চমৎকার উদ্যোগের প্রশংসা করলেও সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনরা কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
তাদের মতে, বাংলাদেশে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে প্রধান বাধা তিনটি :
কপিরাইট সুরক্ষার অভাব : মেধা স্বত্ব বা কপিরাইট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও উদ্ভাবকরা প্রতিনিয়ত পাইরেসির শিকার হচ্ছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের জটিলতা : ব্যাংকগুলো এখনো মেধা বা আইডিয়া দেখে ঋণ দিতে অভ্যস্ত নয়; তারা জমি বা স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক চায়।
দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি : প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সাথে স্থানীয় তরুণদের দক্ষতার ঘাটতি।
আগামী বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য যে ১৫০ কোটি টাকার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, তা যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত করে প্রকৃত মেধার মূল্যায়নে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি সঙ্কট দূর করতে এবং ডলার সঙ্কটের এই সময়ে অর্থনীতিকে একটি নতুন গতি দিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



