পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট

সরকারের গচ্ছা লাখ লাখ টাকা

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জ¦ালানি তেল চুরিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। টোল প্লাজার ভুয়া স্লিপ, অতিরিক্ত জ¦ালানি স্লিপ প্রদান, সিএনজি চালিত ও চালকবিহীন গাড়ির নামে অকটেন বরাদ্দ নিয়ে বাইরে বিক্রিসহ বিভিন্নভাবে তেল চুরি করছে এ সিন্ডিকেট। এতে সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে দেয়া পৃথক অভিযোগের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। অভিযুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

জানা যায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের যাতায়াত কাজে নিয়োজিত রয়েছে অর্ধশতাধিক গাড়ি। এর মধ্যে সেডান কার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের ৪০টির মতো নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। তবে এর পরেও বাইরে থেকে নিয়মিত আরো ২৫ থেকে ৩০টি গাড়ি ভাড়া করা হয়। এসব গাড়ি পরিচালনায় বর্তমানে প্রতি মাসে জ্বালানি খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার লিটার অকটেন। বর্তমানে যার বাজার মূল্য প্রায় ১৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ডিজেল খরচ হচ্ছে আরো প্রায় ৪৫০ লিটার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত ফেব্রুয়ারি মাসের জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব থেকে দেখা যায়, মোট ৩৪টি গাড়ির বিপরীতে ১৩ হাজার ৫৪৪ লিটার অকটেন ব্যবহার করা হয়। ওই সময়ের বাজারদর অনুযায়ী যার মূল্য ১৬ লাখ ২৫ হাজার ২৮০ টাকা (১২০ টাকা লিটার)। তিনটি গাড়ির বিপরীতে ৪৫৫ লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হয়। যার মূল্য ছিল ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা (লিটার ১০০টাকা)। একইভাবে মার্চ মাসে ৩৫টি গাড়ির বিপরীতে ১৩ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন এবং তিনটি গাড়ির বিপরীতে ৪৪৫ লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হয়। যাতে খরচ হয় প্রায় ১৭ লাখ টাকা। গাড়িতে ব্যবহৃত জ্বালানির হিসাব থেকে দেখা যায়, একটি গাড়িতে কমপক্ষে ৬৫ লিটার থেকে সর্বোচ্চ ৭৯০ লিটার অকটেন ব্যবহার করা হয়েছে।

গত ১২ এপ্রিল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং গত ৬ এপ্রিল ও ৩০ এপ্রিল দুদক চেয়ারম্যান বরাবর তিনটি লিখিত আবেদনে অভিযোগ করা হয়, গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের গাড়ি চালক আবু সিদ্দিক মিয়া অর্থের বিনিময়ে তদবির করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাধারণ সেবা অনুবিভাগের যানবাহন শাখায় সমন্বয়কের দায়িত্ব লাভ করেন। দায়িত্ব লাভের কয়েক মাসের মধ্যেই আবু সিদ্দিক মিয়া একাধিক দৈনিক ভিত্তিক গাড়ি চালক ও অফিস সহায়ককে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করেন এবং সেই শূন্য পদগুলোতে নিজের আত্মীয়স্বজনদের নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করেন। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাকরিচ্যুত হয়েছেন ড্রাইভার মাসুদ, মাসুম, শাহাদত, আশিক, অফিস সহায়ক দেলোয়ারসহ আরো অনেকেই। তাদের সবাইকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হয়। আবু সিদ্দিক মিয়া চাকরিচ্যুতদের স্থলে নিজের নিকটাত্মীয় নুরুজ্জামান, সাইদুল, শাহ আলম, সুজনকে নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করেন। আবু সিদ্দিকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সিএনজি চালিত প্রতিটা গাড়ির জন্য প্রতিদিন ৩০ লিটার করে অকটেন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ে তা বিক্রি করে দেন অথচ সেগুলো সিএনজিতে চলে। গাড়িগুলো হলো-ঢাকা মেট্রো গ-২০-৪৯৩২, ঢাকা মেট্রো গ-৪২-০৮৩৪, ঢাকা মেট্রো গ-৪২-৫৮৩৭, ঢাকা মেট্রো গ-২৬ ৩২১০, ঢাকা মেট্রো গ-২৬-৩২১২, ঢাকা মেট্রো গ-৩৯-১৭৮৩, ঢাকা মেট্রো গ-২০-৯৪৮৬, ঢাকা মেট্রো খ-১৩-১৬০৩, ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-১৬০৪, ঢাকা মেট্রো ৮-৫৩-৫১৪। এ ছাড়া চালকবিহীন অনেক গাড়ির জন্য নিয়মিত তেল সংগ্রহ করে সেগুলো বাইরে বিক্রি করে দেয় আবু সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠায় সিন্ডিকেট। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গাড়ির মেরামতের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। আবু সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট গাড়ির মবিল এবং মূল্যবান যন্ত্রপাতি বাইরে বিক্রি করে দেয় এবং নিজেদের মনোনীত ঠিকাদারদের কাছ থেকে গাড়ির ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আবু সিদ্দিক অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে শরীয়তপুরের জাজিরায় নিজ গ্রামে একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি ও কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যবহারযোগ্য অনেক আসবাবপত্র আবু সিদ্দিকের বাড়িতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে তার বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হলেও পরে অর্থের বিনিময়ে তিনি দায়মুক্তি লাভ করেন। এ আবেদনগুলোতে আবু সিদ্দিক মিয়াকে সাধারণ সেবা অনু বিভাগের পরিচালক জিয়াউর রহমান সহযোগিতা করেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগকারী মো: ওবায়দুর খন্দকার নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই আবু সিদ্দিক মিয়া মন্ত্রণালয়ে একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। তেল-মবিলসহ নানা যন্ত্রপাতি স্থাপনের নামে তিনি ভুয়া বিল করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছেন। এ কাজে বাধা দিলে তিনি অন্যান্য গাড়ি চালকদের নানাভাবে হয়রানি করেন।

চাকরি হারানো একজন গাড়ি চালক বলেন, গত ৫ মার্চ কোনো ধরনের নোটিশ দেয়া ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এখন বেতন বন্ধ করে দিয়েছে এমনকি মন্ত্রণালয়েও ঢুকতে দিচ্ছে না। আবু সিদ্দিক মিয়া এভাবে গাড়ি চালকদের বাদ দিয়ে পরে নিজের আত্মীয় স্বজন ও টাকা নিয়ে নতুন লোক নিয়োগ দেয়।

অভিযোগ প্রসঙ্গে যানবাহন শাখার সমন্বয়ক আবু সিদ্দিক মিয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার সময়ে শুধু আমার ভাগ্নে সুজনকে স্যারদের বলে নিয়োগ করে দিয়েছি। এ ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, তারা আমার আত্মীয়ও না। জ্বালানি চুরির সাথে জড়িত বিষয়ে অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। কাউকে চাকরিচ্যুতি ও নতুন নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতাও আমার নেই। ফলে টাকা লেনদেনের অভিযোগও ঠিক নয়। ডুপ্লেক্স বাড়ির যে অভিযোগ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে আমি গ্রামে তিন কক্ষের একটি পাকা বাড়ি করেছি, যা আমার বিদেশে ছয় বছরের বেশি দায়িত্ব পালনের থেকে উপার্জিত টাকা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সাধারণ সেবা অনু বিভাগের পরিচালক জিয়াউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি যোগদানের আগেই আবু সিদ্দিক মিয়াকে মন্ত্রণালয় এ পদে বসিয়েছে। তা ছাড়া আমি আসার পর জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট, ভুয়া বিল করে অতিরিক্ত টাকা নেয়া, মেরামতের নামে ভুয়া বিল নেয়ার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করেছি। প্রমাণ পাওয়ায় কয়েকজন চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। আগের থেকে জ্বালানি ব্যবহারও কমানো হয়েছে বলে তিনি জানান। আবু সিদ্দিক মিয়ার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।

জানা যায়, অভিযোগ পাওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি অভিযোগকারী ও অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণ করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আবু সিদ্দিক মিয়ার দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পায়নি। বরং দৈনিক ভিত্তিক নিয়োজিত গাড়িচালকদের অনেকে ভুয়া বিল-ভাউচার সংশ্লিষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কারণে তাদের কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তা ছাড়া সিএনজি চালিত গাড়িতে অকটেন ব্যবহারের বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আরো অভিযোগ করা হয়, ভুয়া বিল-ভাউচারের জড়িত সিনিয়র কয়েকজন গাড়ি চালক এবং ইতঃপূর্বে চাকরি হারানো কয়েকজন ক্ষোভ থেকে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিচ্ছেন।