হাফেজ সাদ আহমাদ মাদানি
আরবি শব্দ ‘ইস্তিগফার’ শব্দের অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় দোয়া ও তাওবা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে ইস্তিগফার বলা হয়। পাপ মোচনের প্রথম মাধ্যম হলো ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। কুরআনুল কারিমে মহান সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন- ‘বলো, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ; আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আজ-জুুমার, আয়াত-৫৩)
ইস্তিগফার শুধু উচ্চারণে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ; বলা নয়; বরং এটি অন্তরের বিনয়, ভুল স্বীকার, আল্লাহর দরবারে ফিরে আসা এবং তাঁর রহমতের ওপর পূর্ণ ভরসার নাম। অর্থাৎ- ইস্তিগফার এমন এক আধ্যাত্মিক আমল যার মাধ্যমে একজন মুসলিম আত্মশুদ্ধি অর্জন করে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণের দিকে অগ্রসর হয়। কুরআন ও সুন্নাহতে ইস্তিগফারকে মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুরআনের আলোকে ইস্তিগফার : কুরআনের আলোকে ইস্তিগফার শুধু একটি আমল নয়, এটি হলো আল্লাহর করুণা প্রাপ্তির সেতুবন্ধন। পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে ইস্তিগফারের নির্দেশ এসেছে আল্লাহ বলেন- ‘আল্লাহর কাছে তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১০৬)
রহমত ও বরকতের দরজা খুলে দেয় : ইস্তিগফার দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও প্রাকৃতিক অনুগ্রহের অন্যতম মাধ্যম। রহমত ও বরকতের চাবিকাঠি হলো ইস্তিগফার। মহান আল্লাহ বলেন-
‘হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; অতঃপর তাঁর কাছে তওবা করো, তাহলে তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন।’ (সূরা হুদ, আয়াত-৫২)
রিজিক ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে : ইস্তিগফার দরিদ্রতা দূর করে, রিজিকের পথ প্রসারিত করে ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন- ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা।’ (সূরা নূহ, আয়াত : ১০-১২)
গুনাহ থেকে মুক্তির পথ : ইস্তিগফারের মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় এবং অন্তরের আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি জুুলুম করবে; অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১১০)
আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপত্তা : ইস্তিগফার ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কে বিপদ ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে। ইস্তিগফাররত অবস্থায় আল্লাহ শাস্তি বা আজাব দেন না। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে- ‘আল্লাহ এমন নন যে, তাদেরকে আজাব দেবেন এ অবস্থায় যে, তুমি তাদের মাঝে বিদ্যমান এবং আল্লাহ তাদেরকে আজাব দানকারী নন এমতাবস্থায় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে।’ (সূরা আল-আনফাল, আয়াত-৩৩)
শক্তি-সামর্থ্য জোগায় : যে বান্দা ইস্তিগফার করে আল্লাহ তার শরীরে বিশেষ শক্তি দান করেন। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বলেছেন-
‘হে আমার জাতি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; অতঃপর তাঁর কাছে তওবা করো, তাহলে তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরো শক্তি বৃদ্ধি করবেন।’ (সূরা হুদ, আয়াত-৫২)
তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় : নিয়মিত ইস্তিগফার বান্দার অন্তরে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি জাগিয়ে তোলে, তাকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং ধীরে ধীরে তাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে। মহান আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত-২২২)
হাদিসের আলোকে ইস্তিগফার : রাসূলুল্লাহ সা:-এর অন্যতম নিয়মিত আমল ছিল ইস্তিগফার। তাঁর এই ধারাবাহিক ইস্তিগফারই মুমিনের জন্য সর্বোত্তম সুন্নাত এবং অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে ৭০ বারেরও বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করে থাকি।’ (বুখারি)
আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় দোয়া : আল্লাহর কাছে প্রিয় দোয়া ও আমল হলো ইস্তিগফার, আর ইস্তিগফারের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার হলো বান্দার এ দোয়া পড়া- হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহই নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সাথে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নিয়ামত দিয়েছ তা স্বীকার করছি, আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও, কারণ তুমি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।’
যে ব্যক্তি দিনের (সকাল) বেলায় দৃঢ়বিশ্বাসের সাথে এ ইস্তিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতের (প্রথম) বেলায় দৃঢ়বিশ্বাসের সাথে এ দোয়া পড়ে নেবে আর সে ভোর হওয়ার আগেই মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে।’ (বুখারি)
দুশ্চিন্তা ও কষ্ট দূর করে : যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার জন্য দুশ্চিন্তা ও সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন। হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সদাসর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ ও প্রতিটি সঙ্কট থেকে উদ্ধারের পথ বের করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক দান করবেন।’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
আল্লাহ বারবার ক্ষমা করেন : আল্লাহ বান্দার ইস্তিগফারকে অনেক বেশি ভালোবাসেন, তাই বান্দা যতই গুনাহ করুক না কেন ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি মাফ করে দেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকবে এবং ক্ষমার আশা রাখবে, ততক্ষণ আমি তোমাকে ক্ষমা করব। তোমার অবস্থা যাই হোক না কেন, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহ যদি আকাশের যে পর্যন্ত দৃষ্টি যায়/প্রকাশ পায় সে পর্যন্ত পৌঁছে থাকে অতঃপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি জমিন ভরা গুনাহ নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে থাকো, তাহলে আমি জমিন ভরা ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হবো।’ (আত-তিরমিজি)
হৃদয় পরিশুদ্ধ ও ঈমানকে শক্তিশালী করে : ইস্তিগফার হৃদয়ের কালো দাগ দূর করে এবং হৃদয়কে পরিশুদ্ধ ও আলোকিত করে, ফলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘মুমিন ব্যক্তি যখন গুনাহ করে তখন তার কলবে একটি কালো দাগ পড়ে; অতঃপর সে তওবা করলে, পাপকাজ ত্যাগ করলে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার কলব পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়।’ (ইবনে মাজাহ)
জান্নাতের পথ সুগম করে : আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করতে পছন্দ করেন আর যখন তিনি ক্ষমা করেন তখন তিনি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেন এবং জান্নাতের দিকে নিয়ে যান। তাই ইস্তিগফার হলে হলো জান্নাতের পথে সফলতার প্রথম ধাপ। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার আমলনামায় অধিক পরিমাণে ক্ষমা প্রার্থনা যোগ করতে পেরেছে, তার জন্য সুসংবাদ, আনন্দবার্তা।’
(ইবনে মাজাহ)
নবীদের তওবা ও ইস্তিগফার : নবীরাও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করেছেন। তাদের তওবা ও ইস্তিগফারের ঘটনা ও ভাষা কুরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফে বিবৃত হয়েছে। এখানে কয়েকজন নবীর তওবা ও ইস্তিগফারের বর্ণনা তুলে ধরা হলো-
হজরত আদম আ:-এর তওবা ও ইস্তিগফার : ‘হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।’ (সূরা আ’রাফ, আয়াত-২১)
হজরত নূহ আ:-এর তওবা ও ইস্তিগফার : ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি জালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না।’ (সূরা নূহ, আয়াত-২৮)
হজরত ইউনুস আ:-এর তওবা ও ইস্তিগফার : ‘আপনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিম।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-৮৭)
হজরত মুহাম্মদ সা:-এর তওবা ও ইস্তিগফার : ‘আমার অন্তর ক্ষণিক বাধাপ্রাপ্ত হয়, আর আমি দিনে ১০০ বার আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই।’ (মুসলিম) ইবন উমার রা: বলেন, একই মজলিসে বসে নবী সা:-এর (এই ইস্তিগফারটি) পাঠ করা অবস্থায় ১০০ বার পর্যন্ত গুণতাম। ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করো, আমার তওবা কবুল করো, নিশ্চয় তুমি অতিশয় তওবা কবুলকারী, পরম দয়াময়।’ (আবু দাউদ ও তিরমিজি)
ইস্তিগফার শুধু একটি দোয়া নয়; বরং মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুরআন ও সুন্নাহ বারবার আমাদের শিখিয়েছে, ইস্তিগফার মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে, জীবনে শান্তি আনে, বিপদ থেকে মুক্তি দেয় এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের পথ উন্মুক্ত করে। নবীরা নিজে ইস্তিগফার করেছেন এবং উম্মতকেও এর ওপর অটল থাকতে শিখিয়েছেন। শাস্তির দিন এসে পড়ার আগে পাপীর উচিত পাপ বর্জন করে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। নবী সা: একদিন মহিলাদের উদ্দেশে বললেন, ‘হে নারীসমাজ! তোমরা দান-সাদকাহ করতে থাকো ও বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করো। কারণ আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের অধিবাসীদের অধিকাংশই তোমাদেরকে দেখলাম।’ (বুখারি ও মুসলিম)
তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত দিনের প্রতিটি সময়ে, সুখে-দুঃখে, গোপনে-প্রকাশ্যে আন্তরিকতার সাথে ইস্তিগফার করা। এতে দুনিয়ার কল্যাণও আছে, আখিরাতের সফলতাও আছে।
ইস্তিগফারই হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও জীবনের সব অশান্তি দূর করার সর্বোত্তম চাবিকাঠি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার সগিরা-কবিরা গুনাহসহ সব ধরনের অন্যায়-অপরাধ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে সব ধরনের গুনাহ থেকে তওবা ও ইস্তিগফার করার তাওফিক দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
লেখক : প্রবন্ধকার



