নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গত শুক্রবার সন্ধ্যাটি ছিল কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য এক চরম বিস্ময় ও রহস্যের। দিগন্তের আকাশে হঠাৎ উদিত হওয়া এক তীব্র আলোর রেখা, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী ছিল, মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিনগ্রহের যান বা উল্কাপাতের গুজব ছড়িয়ে পড়লেও, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কাছে এর অর্থ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। এটি ছিল ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত একটি অত্যাধুনিক ‘পারমাণবিক-সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ (আইসিবিএম)-এর সফল পরীক্ষা।
ভারতের ওড়িশা উপকূলের আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে উৎক্ষিপ্ত এই ক্ষেপণাস্ত্রটি কেবল ভারতের সামরিক শক্তিই জানান দেয়নি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আকাশসীমা ও বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে এক নতুন ও জটিল মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দু প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরীক্ষাটি ছিল ভারতের বহুল আলোচিত ‘মিশন দিব্যাস্ত্র’-এর একটি বর্ধিত সংস্করণ। প্রযুক্তিগতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি এমআইআরভি (মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল) প্রযুক্তি সমৃদ্ধ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র একটি মাত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে; কিন্তু এমআইআরভি প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি একক ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র ভারতকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে এখন কেবল এশিয়া নয়, বরং ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের একাংশও ভারতের আঘাত হানার সীমার মধ্যে চলে এসেছে। এটি ভারতকে বিশ্বের মাত্র গুটিকয়েক শক্তিশালী দেশের (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও ব্রিটেন) তালিকায় স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
চীন ও বৈশ্বিক শক্তির জন্য এক ‘কঠোর’ বার্তা
এশীয় গণমাধ্যম, বিশেষ করে হংকংভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ এবং জাপানিজ ‘নিক্কি এশিয়া’-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের এই পরীক্ষার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বেইজিংকে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করা। হিমালয় সীমান্তে চলমান উত্তেজনা এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির বিপরীতে ভারত প্রমাণ করল যে, তাদের হাতে এখন এমন অস্ত্র আছে যা চীনের যেকোনো গভীরতম প্রদেশে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
ভারতের জন্য এটি কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং একটি ‘কৌশলগত প্রতিরোধ’। এর মাধ্যমে ভারত বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে বুঝিয়ে দিল যে, দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত আর কেবল আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না। অন্য দিকে বাংলাদেশের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ভোলা থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উজ্জ্বল পথরেখা দৃশ্যমান হওয়া একটি গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরীক্ষার প্রভাব ত্রিমাত্রিক:
ভৌগোলিক নৈকট্য ও দুর্ঘটনা ঝুঁকি : ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ স্থল থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব কয়েক শ’ কিলোমিটার মাত্র। আকাশপথে এই ক্ষুদ্র দূরত্বে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বা বিচ্যুতি ঘটলে তার ফলাফল বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে। যদিও ভারত সাধারণত পরীক্ষার আগে নৌযান ও উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য সতর্কতা (নোটাম) জারি করে, তবুও সাধারণ জনমনে এক ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকেই যায়।
বঙ্গোপসাগরের সামরিকীকরণ : এই পরীক্ষার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর এখন বড় বড় শক্তিগুলোর সমরাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নিয়ে যে নীল অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে, এই অঞ্চলের সামরিকায়ন সেখানে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা : ভারতের এই সক্ষমতা বাংলাদেশকে তার দুই প্রতিবেশী (ভারত ও চীন) এর সাথে ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এক দিকে ভারত বন্ধুরাষ্ট্র হলেও, এই ধরনের উচ্চ ক্ষমতার অস্ত্র প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কার্যত এক ‘নিস্পৃহ দর্শক’ হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
এ দিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিভাগ ভারতের এই পরীক্ষার ওপর কড়া নজরদারি রাখার ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই আইসিবিএম পরীক্ষা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন ‘আর্মস রেস’ বা অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরু করতে পারে। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই তাদের ‘আবাবিল’ বা ‘শাহীন’ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা ভাবছে।
এর ফলে এই অঞ্চলের উন্নয়নমুখী অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের সরঞ্জামে অতিরিক্ত বিনিয়োগ আঞ্চলিক দারিদ্র্য বিমোচন ও শিক্ষার ওপর বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া, ভারত ও চীনের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ যদি আরো তীব্র হয়, তবে তার কেন্দ্রে থাকবে বঙ্গোপসাগর- যা সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ভারতের এই আইসিবিএম পরীক্ষা কেবল একটি যান্ত্রিক সফলতার গল্প নয়, বরং এটি ভূ-রাজনীতির এক বিশাল দাবার ঘুঁটি। কক্সবাজারের পর্যটকরা যে আলোর রেখা দেখে বিস্মিত হয়েছেন, তা আসলে আধুনিক যুদ্ধের এক ভয়াবহ রূপ। এক দিকে ভারতের গ্লোবাল পাওয়ার হওয়ার আকাক্সক্ষা, অন্য দিকে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির ভারসাম্য- এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগরের এক কৌশলগত এবং স্পর্শকাতর অবস্থানে করছে। অদূর ভবিষ্যতে এই ধরনের পরীক্ষাগুলো কেবল ভারতের সীমানায় সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে, বরং তা পুরো এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক মেরুকরণ বদলে দেবে।



