- নৌপথে ঢুকছে মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড থেকে
- আকাশপথে পৌঁছে যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকায়
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। যেখানে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও আইসের পাশাপাশি বিভিন্ন মাদক পাচার হচ্ছে। ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও ক্রিসেন্টের’ মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এটি মাদক সিন্ডিকেটগুলোর নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দেশের তরুণ সমাজ ও নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আফিম ও সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল হলো ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই মাদক বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে উৎপাদিত ইয়াবা (মেথামফেটামিন) এবং আইস (ক্রিস্টাল মেথ) সরাসরি সীমান্তের নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফ ও উখিয়া পয়েন্ট দিয়ে দেশে আসে। ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্য হয়েও বিপুল পরিমাণ মাদক বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়েও প্রবেশ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত অঞ্চল) সংলগ্ন হওয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট বা ‘সেফ প্যাসেজ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরবর্তীতে তা আকাশপথ ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। এই চক্রটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে যেমন হুমকির মুখে ফেলছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ করছে।
পাচারের রুট ও ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশ : মাদককারবারিরা বাংলাদেশকে কেবল একটি বড় বাজার হিসেবেই দেখছে না, বরং ইউরোপ ও আমেরিকায় মাদক পাঠানোর জন্য একটি নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এর প্রধান কারণগুলো ও ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়ে জানায়, বঙ্গোপসাগরের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের কৌশলগত অবস্থান পাচারকারীদের আকৃষ্ট করে। এ ছাড়াও ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে কোকেন ও হেরোইন পাচারের একাধিক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে।
পোশাক রফতানির আড়ালে মাদক পাচার : বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরী পোশাকের (আরএমজি) বড় বড় চালানের আড়ালে মাদক লুকিয়ে ইউরোপের বাজারে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কারণ বাংলাদেশের পণ্যবাহী কনটেইনারগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক বন্দরে নিয়মিত তল্লাশির আওতার বাইরে থাকে।
ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে সংযোগ : আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলো দক্ষিণ আমেরিকা (বিশেষ করে পেরু ও কলম্বিয়া) থেকে কোকেন সংগ্রহ করে আফ্রিকা বা এশিয়ার কোনো দেশ হয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এরপর বাংলাদেশ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে সেগুলো ইউরোপের মাদ্রিদ, লন্ডন বা প্যারিসের বাজারে পাঠানো হয়। একইভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের হেরোইন ও সিন্থেটিক মাদকগুলো বাংলাদেশ থেকে পাড়ি জমায় উত্তর আমেরিকায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে দেখা গেছে, নাইজেরিয়া এবং অন্যান্য পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলোর নাগরিকরা অনেক সময় বাংলাদেশে অবস্থান করে এই আন্তর্জাতিক পাচার প্রক্রিয়ার সমন্বয় করে।
ভারতের সীমান্ত ও আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক : ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘ ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের অনেক এলাকা দুর্গম ও অরক্ষিত। মিয়ানমার থেকে ভারতে আসা মাদক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে। বিশেষ করে ‘ফেনসিডিল’ এবং ‘হেরোইন’ পাচারে এই রুটগুলো সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় ও বাংলাদেশী পাচারকারীদের মধ্যে একটি গভীর আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। যারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিচ্ছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব : বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার ফলে মাদকের একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ বাজারে থেকে যাচ্ছে। ইয়াবা ও আইসের ব্যাপক বিস্তার দেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ ছাড়াও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ, গ্যাং কালচার এবং সীমান্তে অস্থিরতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
উত্তরণের পথ সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার : বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তে আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে থার্মাল ইমেজিন, ড্রোন ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। নাফ নদীতে নৌবাহিনী, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সমন্বয় : যেহেতু এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই ইন্টারপোল, ইউএনওডিসি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সাথে সঠিক সময়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে এবং চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিমানবন্দরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্ক্যানার স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে যাতে কনটেইনার বা কার্গোর ভেতরে লুকানো মাদক শনাক্ত করা যায়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বিমসটেক বা সার্কের মতো আঞ্চলিক মঞ্চে মাদক পাচার রোধে মিয়ানমার ও ভারতকে আরো কার্যকর চাপে রাখা জরুরি। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে মাদক পাচারের একটি বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের বিষাক্ত ছোবল থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে কেবল অভ্যন্তরীণ ধরপাকড় যথেষ্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এক মহাবিপদ হয়ে দাঁড়াবে। তাই এখনই সময় সমন্বিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করার।



