ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা
সিলেটের ওসমানীনগরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ সম্বোধন করে ক্ষমা চাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে এক অভিজাত মিষ্টির দোকানের কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, জরিমানার জেরে ওই কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলেও পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে তার চাকরি বহাল থাকে। তবে তাকে শোরুম থেকে কারখানায় বদলি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগকৃত এই ইউএনওর একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বর্তমান সরকারকে কৌশলে বিতর্কিত করার অভিযোগ তুলছেন স্থানীয় অভিজ্ঞমহল।
ভুক্তভোগী ও শোরুম সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার আগে পাশের বালাগঞ্জ উপজেলার ইউএনও তাজপুর বাজারস্থ ‘বনফুল’ শোরুম থেকে মিষ্টি কিনে বাসায় নেয়ার পর দেখেন মিষ্টিগুলো পুরাতন। তিনি বিষয়টি ওসমানীনগর ইউএনও মুনমুন নাহার আশাকে জানান। এর জেরে ঈদের পরদিন শুক্রবার বিকেলে ওসমানীনগর ইউএনও সাধারণ ক্রেতার বেশে একা ওই শোরুমে আসেন। তিনি সেখানে কর্তব্যরত কর্মচারী আব্দুল মান্নানকে মিষ্টিগুলো নতুন কি না জিজ্ঞেস করলে মান্নান জানান, ড্রাই মিষ্টিগুলো ঈদের আগের এবং নরমাল মিষ্টিগুলো আজকের। তখন ইউএনও বলেন, ‘তোমরা মানুষকে বাজে মিষ্টি দাও, আমার কাছে অভিযোগ আছে।’ মান্নান তখন বিষয়টি তাদের ম্যানেজারকে জানাতে বললে ইউএনও উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘তুমি বেয়াদবি করছ, চেনো আমি কে? আমি ইউএনও, তোমাকে জেলে দেবো!’ এতে ভয় পেয়ে মান্নান শোরুম থেকে পালিয়ে যান।
পরে প্রধান শোরুম ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া এসে ইউএনওকে শান্ত করেন এবং মান্নানকে মসজিদ থেকে ডেকে আনেন। এ সময় সহকারী ম্যানেজার ক্যাশ টেবিলে বসে কথা বলায় ইউএনও আবার ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ‘বেয়াদব’ আখ্যা দেন। একপর্যায়ে ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়া ইউএনওর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং কর্মচারী মান্নানকে ক্ষমা চাইতে বলেন। মান্নান তখন অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘আপা ভুল হয়েছে, আমাকে মাফ করে দেন’ বলা মাত্রই ইউএনও তীব্র ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ ডেকে মান্নানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে বনফুল কর্তৃপক্ষ মান্নানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।
গত ১ জুন দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা উপজেলা পরিষদে আসলে ভুক্তভোগী মান্নান তার দ্বারস্থ হন। এমপি লুনা তার চাকরি বহাল রাখতে স্থানীয় বিএনপির দুই নেতাকে বনফুল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব দেন। বর্তমানে মান্নানকে সিলেট নগরীর খাদিম বিসিক শিল্প এলাকায় বনফুলের কারখানায় বদলি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কর্মচারী আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে বনফুলে চাকরি করছি, আমার কোনো বাজে রেকর্ড নেই। সাধারণ তথ্য দেয়ার পর আপা বলে ক্ষমা চাওয়ায় পুলিশ ডেকে আমার ওপর এই অবিচার করা হয়েছে।’ শোরুম ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বলেন, ‘কর্মচারী মান্নান ইউএনও ম্যাডামকে না চিনে গুরুত্ব দেয়নি, পরে ‘আপা’ বলে ফেলায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বিষয়টি পত্রিকায় না লিখলে আমাদের জন্য ভালো।’
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘ওসমানীনগর ইউএনও আমার কলিগ। তবে তিনি ‘আপা’ ডাকার জন্য জরিমানা করতে পারেন না। হয়তো আউটলেটে কোনো সমস্যা দেখে জরিমানা করেছেন।’ এ দিকে ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস টি এম ফখর উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন। তবে এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসমানীনগর ইউএনও মুনমুন নাহার আশার সরকারি মোবাইলে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, বর্তমান ইউএনও ওসমানীনগরে যোগদানের পর থেকেই নানাবিধ বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। ইতঃপূর্বে তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী সিসিটিভি ক্যামেরা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সিসিটিভি প্রকল্পের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সরিয়ে ছুটির দিনে তড়িঘড়ি করে প্রশাসক বসানো, সরকারি চাল রাখার অভিযোগে ছাত্রদল নেতা আবিরকে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং বারুনী মেলায় লটারির টিকিট বিক্রির অভিযোগে যুবদল নেতাকে জেল-জরিমানা করার মতো একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। ইউএনওর এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ও তার প্রত্যাহারের দাবিতে ইতঃপূর্বে তাজপুর বনফুলের সামনে স্থানীয়রা মানববন্ধনও করেছেন।



