অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের উন্নতি দিয়েই নতুন সপ্তাহ শুরু হয়েছে পুঁজিবাজারে। শুরুতে সাময়িক বিক্রয়চাপে থাকলেও গতকাল রোববার দিনের বেশির ভাগ সময় সূচকের উন্নতি ধরে রাখে পুঁজিবাজারগুলো। তবে বরাবরের মতোই ব্যাংকিং খাতে ভর করেই সূচকের এ উন্নতি ঘটে। বেশির ভাগ খাতে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতটিও গতকাল দুই বাজার সূচকের উন্নতিতে কমবেশি ভূমিকা রাখে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সামনে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ তিনটি খাতের অর্থবছর শেষ হবে। ফলে এ তিনটি খাতে লভ্যাংশ ঘোষণাকে সামনে রেখেই এ তিনটি খাতে আগ্রহ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।
গতকাল লেনদেনের শুরুতে কিছু সময়ের জন্য বিক্রয়চাপের মুখে ছিল দুই পুঁজিবাজার। তবে সাময়িক এ চাপ কিছুক্ষণের মধ্যেই সামলে নেয় বাজারগুলো। দিনের বাকি সময় বড় ধরনের আর কোনো বিক্রয়চাপ তৈরি না হলে উভয় পুঁজিবাজারই সবগুলো সূচকের উন্নতি দিয়ে লেনদেন শেষ করে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৯ দশমিক ০৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। পাঁচ হাজার ১৫৪ দশমিক ৩০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৬৮ ও ৮ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। ১৪ হাজার ৪৬৯ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেন শেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৫৭২ দশমিক ৫৬ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৮০ দশমিক ৯৪ ও ৬৫ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্প্রতি পুঁজিবাজার আচরণে যে ইতিবাচক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে তা মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে। সামনে গণতান্ত্রিক সরকার এলে দেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে যার প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়বে। এ প্রত্যাশাকে সামনে রেখে ব্যাপক লোকসানের মধ্যে থাকা বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আশার আলো দেখছেন। যে ব্যাংক খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি লোকসানের মধ্যে রয়েছেন সেই ব্যাংকিং খাত দিয়েই তারা নিজেদের পুঞ্জীভূত লোকসান পুষিয়ে নিতে চান। তাই সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া বাজারে সূচকের উন্নতিতে বরাবরই এ খাতটির অবদান থাকে বেশি। সম্প্রতি পুঁজিবাজারে যখনই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটেছে তা ব্যাংকিং খাতের ওপরই ভর করে। অন্যান্য খাতগুলোতেও কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি থাকলেও তা মূল্যস্তরের দিক থেকে বেশির ভাগ সক্ষমতা হারানো বিনিয়োগকারীর নাগালের বাইরে।
দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট এ তিনটি খাত ছাড়া অন্য খাতগুলোতে লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগই গতকাল দরপতনের শিকার ছিল। ব্যাংকিং খাতের যেসব কোম্পানি বিগত সরকারের আমলে বড় কোনো অনিয়মের মধ্যে ছিল না এগুলোই এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। গত অর্থবছরেও এসব কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ দিয়েছে শেয়ারহোল্ডারদের। সামনের দিনগুলোতে এ ব্যাংকগুলো ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে এমন ধারণা থেকেই তাদের এ অবস্থান। তবে অন্যান্য খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগও গতকাল মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নিতে দেখা যায়।
এদিকে হঠাৎ করে একই ঘরানার দু’টি কোম্পানি ব্যাংকিং খাতের ইসলামী ব্যাংক এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতের ইবনে সিনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়। বিগত সরকারের আমলে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকই সবচেয়ে বেশি অনিয়মের শিকার ছিল। অবস্থা এমন নাজুক হয়ে যায় যে গত ২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটি কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি যা ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথমবার। কিন্তু গতকাল লেনদেনের এক পর্যায়ে কোম্পানিটির শেয়ারের কোনো বিক্রেতা ছিল না। গত ১১ জানুয়ারি ঢাকা শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার বেচাকেনা হয়েছিল ৩৫ দশমিক ৫০ টাকায়। কিন্তু গতকাল ব্যাংকটির শেয়ার বেচাকেনা হয়েছে দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দর ৪৭ দশমিক ৭০ টাকায়। মাত্র ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। অথচ গত তিনটি প্রান্তিক মিলিয়ে কোম্পানিটির আয় দেখাচ্ছে ৬২ পয়সা। বিষয়টি নিয়ে বাজারে বিভিন্ন ধরনের কথা চাউর হয়েছে। প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি একটি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে নতুন করে একটি গ্রুপ বোর্ডে আসতে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনছেন এমন কিছু কথা শোনা যাচ্ছে।
অনুরূপভাবে ওষুধ ও রসায়ন খাতের ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারেও বিনিয়োগকারীদের প্রচণ্ড আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ৩৪১ টাকার লেনদেন হওয়া কোম্পানিটির শেয়ার গতকাল ৩৬৯ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। গত ৪ জানুয়ারি ৩১৩ টাকায় লেনদেন হওয়া কোম্পানিটির শেয়ার এ কয়দিনে বেড়েছে প্রায় ৫৮ টাকা।
গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। ২৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৭৬ লাখ ৩৮ হাাজর শেয়ার হাতবদল হয়েছে গতকাল। ১৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় ২৬ লাখ ৩৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইসলামী ব্যাংক, ফাইন ফুডস, লাভেলো আইসক্রিম, সিটি ব্যাংক, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ইনফিউশন, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেড ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস।
দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং কোম্পানি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। গতকাল ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের ইসলামী ব্যাংক। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ব্যাংক, কনফিডেযন্স সিমেন্ট, আলহাজ টেক্সটাইলস, সিএসপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, এপেক্স স্পিনিং ও স্যালভো কেমিক্যালস।



