আলজাজিরা
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ অভিযানকে ‘মেজর কমব্যাট অপারেশন’ বা বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
হামলার কেন্দ্রবিন্দু ও তীব্রতা
শনিবার সকালে ইসরাইল প্রথম এই মিসাইল হামলার ঘোষণা দেয়। পরে মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে, এটি একটি যৌথ অভিযান। ইরাক যুদ্ধের পর এ অঞ্চলে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ। ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যানুযায়ী হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল।
রাজধানী তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট, জমহুরি এলাকা ও ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের সদর দফতর। খামেনির অফিসের নিকটবর্তী এলাকা এবং তেহরানের উত্তরে সাইয়্যেদ খন্দান এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। অন্যান্য শহরের মধ্যে কোম, তাবরিজ, ইসফাহান, কেরমানশাহ, ইলাম, কারাজ ও লরেস্তান প্রদেশেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঙ্কার
অভিযান শুরুর পর এক সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো তাদের মিসাইল শিল্পকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া এবং তাদের নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা।’
তিনি আরো সতর্ক করেন যে, ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো (হামাস, হিজবুল্লাহ ও হাউছি) আর এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৭৩ বছর আগে সিআইএর মাধ্যমে ইরানে যেভাবে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছিল, এবার ট্রাম্প সরাসরি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সেই একই ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ পথে হাঁটছেন।
ইরানের পাল্টা আঘাত
হামলার পরপরই ইরান কঠোর জবাব দিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, ইরান থেকে উত্তর ইসরাইল লক্ষ্য করে একঝাঁক মিসাইল ছোড়া হয়েছে। উত্তর ইসরাইলজুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা তোমাদের সতর্ক করেছিলাম! এখন তোমরা এমন পথ বেছে নিয়েছ যার শেষ তোমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।’
নেতৃত্বের নিরাপত্তা ও বর্তমান অবস্থা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবস্থান নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে। কয়েক দিন ধরে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি এবং তার কম্পাউন্ডের দিকের রাস্তাগুলো কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বর্তমানে সুরক্ষিত ও অক্ষত আছেন।
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি ও নিহতের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দিনব্যাপী এই অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে, যার ফলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের পাল্টা আঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাল্টি-ডে অপারেশন’ পরিকল্পনা বিশ্বকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।



