রাজশাহী ব্যুরো
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, জনগণের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। আমরা জীবন দিতে পারি, কিন্তু দেশের মর্যাদা বিকিয়ে দেবো না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে গতকাল শনিবার বিকেলে রাজশাহীর মাদরাসা ময়দানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এমপি বলেন, যাদের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আজ সংসদ ও গণভোট সম্ভব হয়েছে, তাদেরই এখন অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। তরুণদের আত্মত্যাগের ফলেই দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার এখন এসব আন্দোলনকারীকে শিশু সংগঠন বা গুপ্ত সংগঠন বলছে। কিন্তু জনগণের ৭০ শতাংশ রায়কে অস্বীকার করা যাবে না। এখনো সময় আছে বলুন, আমরা জনগণের রায় মেনে নিচ্ছি। তাহলে জনগণ আপনাদের ক্ষমা করবে।
তিনি আরো বলেন, আপনারা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ ক্ষমতায় বসবে না। অথচ এখন ৪৭ জেলায় প্রশাসক বসানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরা গুম কমিশন চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনারাও স্বৈরাচারী পথেই হাঁটছেন। তিনি বলেন, ভালো কাজ করলে আমরা পানির মতো তরল থাকবো, আর অন্যায় করলে ইস্পাতের মতো কঠোর হবো। আপনারা চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখন সমঝোতার নামে চাঁদাবাজি বৈধ করা হচ্ছে। অনেকে এখন বলছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আজ চাঁদাবাজ দলে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সবখানে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে। সংসদে কথা বলতে না দিলে আমরা রাজপথে কথা বলবো। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। যারা হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ায়, তারা কোনো হুমকিকে ভয় পায় না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা প্রতিবেশী দেশকে সম্মান করি, কিন্তু আমাদের দিকে চোখ রাঙাবেন না। আমাদের ঘুম হারাম করলে আমরাও আপনাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না। বাংলাদেশের পদ্মা ও তিস্তার বিশাল অংশ আজ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদীকে তার যৌবন ফিরিয়ে দিতে হবে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা ভালো কাজের পক্ষে সবসময় থাকবো। কিন্তু অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করবো। জনগণের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। আমরা জীবন দিতে পারি, কিন্তু দেশের মর্যাদা বিকিয়ে দেবো না।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপির সভাপতিত্বে এবং রাজশাহী মহানগরী সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল ও রাজশাহী জেলা সেক্রেটারি গোলাম মুর্তজার যৌথ পরিচালনায় সমাবেশে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পাটির মুখ্য সংগঠক সার্জিস আলম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল কাইউম সোবহানী, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, জাগপার কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, এনসিপির নেত্রী মনিরা শারমিনসহ জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন জেলার আমির, ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ (বীরবিক্রম) বলেন, ‘বাংলাদেশকে অশান্ত করার ব্যাপারে ভারত এখন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় কাদের সিদ্দিকীসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী ভারতে আশ্রয় নিয়ে বিবাড়িয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বর্ডার অস্থিতিশীল করেছিল। এটাকে ঠিক করতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী খুব ভালো লোক ছিলেন। ভদ্র লোক ছিলেন। উনি এ সমস্যা নিজেই সমাধান করেছিলেন। কিন্তু এখন ভালো লোক, ভদ্রলোক ভারতের ক্ষমতায় নেই।’
অলি আহমেদ বলেন, ‘বিদেশী দালালদের কারণে আমরা গত ১৯ বছর অনেক কষ্ট পেয়েছি। এই দালালদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের হাত-পা ভেঙে দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে দেখতে হবে শুভেন্দুর কোনো ফলোয়ার আছে কি না। এই গরুটা ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছে- যুদ্ধ ঘোষণা করব, বাংলাদেশ দখল করে নেব। এটা তোমার বাপের দেশ তুমি দখল করে নিবা? আর আমরা যদি বলি- আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, সেভেন সিস্টার্স সব দখল করে নিব, তখন কী বলবা? আমরা তো সেটা বলছি না। আমরা বলি আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দাও। তুমি তোমার ঘরে শান্তিতে থাকো। তোমার ব্যাপারে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করব না, এটা তোমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু তোমরা প্রতিনিয়ত আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছ।’
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, যতদিন জনগণের রায় বাস্তবায়িত না হবে, ততদিন আন্দোলন চলবে। সরকার ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েও জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়েছে। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানাতেই হবে।
তিনি বলেন, সরকার সাড়ে চার কোটি মানুষের রায়কে অস্বীকার করছে। জনগণের রায় মানা না হলে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও গণভোটের প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। অথচ এখন বলা হচ্ছে জনগণ গণভোট বোঝে না। বিএনপি নেতারা পাগল হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ পাগল নয়। তারা বুঝেশুনেই ভোট দিয়েছেন। তাই দ্রুত জনগণের রায় মেনে নিতে হবে।
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের তিন মাসের মধ্যেই ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অস্বীকার করেছে। বাংলাদেশ কারো ক্রীতদাস নয়। জুলাই আন্দোলনের মূলমন্ত্র ছিল- ‘মেধা, মেধা’। অথচ এখন সর্বত্র দলীয়করণ চলছে এবং মেধার পরিবর্তে কোটাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইউম সুবহানী বলেন, জুলাই সনদ অস্বীকার করা বিএনপির সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ১১ দলীয় ঐক্যের উচিত এই রায়ের বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামা। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, জুলাই আন্দোলন না হলে আজ অনেকে দেশে ফিরতেই পারতেন না। জনগণের সাথে প্রতারণা করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। আমরা পদ্মা নদীর ন্যায্য হিস্যা চাই এবং সরকারকে ভারতের কাছ থেকে তা আদায় করতে হবে।
নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির যে আদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেই একই সাংবিধানিক ভিত্তিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বৈধ হলে গণভোট কেন অবৈধ হবে? বিএনপির সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হলো দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অস্বীকার করা। জনগণ এর দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমরা ভেবেছিলাম ক্ষমতায় যারা আসবে তারা শিক্ষা নেবে। কিন্তু বিএনপি সরকার তিন মাস না যেতেই অতীত ভুলে গেছে। মানুষ তারেক রহমানকে দেখে নয়, জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব দেখে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। অথচ ক্ষমতায় এসেই তারা ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে উপহাস করছে। তিনি বলেন, সীমান্তে প্রতিদিন মানুষ হত্যার ঘটনা আবার বাড়ছে। দেশে নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। বিএনপি কি শুধু বিএনপির সরকার, নাকি পুরো বাংলাদেশের সরকার? আমরা জাতীয় নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে চাইলে আমরা ঘরে বসে থাকবো না।
তিনি আরো বলেন, বিএনপি খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে এজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু নদীতে পানি না থাকলে খাল খনন করে কী লাভ? জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান বলেন, মওলানা ভাসানী ফারাক্কা ইস্যুতে এখানেই সমাবেশ করেছিলেন। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি থাকবে। ভারতের সাথে গোপন সমঝোতা বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না।
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, আমাদের সামনে জীবন দিয়ে আবু সাঈদ ভাই বলে গেছেন দেশকে রক্ষা করতে হলে রক্ত দিতে হবে। আমরা এখানে চাঁদাবাজি করতে আসিনি। আমরা এসেছি ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের অধিকার রক্ষার জন্য। অনেক ভাই আজ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছেন। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে আমাদের ভোট চুরি করা হয়েছে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা নীরব ছিলাম। জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে বলতে চাই আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে বাধ্য করবেন না। জুলাই সনদ নিয়ে তামাশা করবেন না। জনগণের রায় নিয়ে গড়িমসি করলে আপনাদের পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হবে।
জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী আমির ড. মাওলানা কেরামত আলী বলেন, ভোট নেয়ার সময় জনগণের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলেও ক্ষমতায় এসে তাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমরা জনগণের রায় বাস্তবায়ন করেই ছাড়বো।



