নিজস্ব প্রতিবেদক
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। গতকাল বিকেলে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজউন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগছিলেন।
স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে ডা: রাইহান রব্বানী ও ডা: মো: তৌহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বয়সজনিত নানা রোগে ভোগছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৪টায় নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। আইসিইউর সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা: রাইহানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আজ বিকেল সাড়ে ৩টায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ মাগরিবের নামাজের পর ঢাকার ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর লাশ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। আগামীকাল লাশ হেলিকপ্টার বা ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে তার জন্মস্থান ভোলায় নেয়া হবে। সেখানে জোহরের নামাজের পর দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন এবং তৎকালীন ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা বহুল পরিচিত ‘মুজিব বাহিনী’র অন্যতম শীর্ষ কমান্ডার ছিলেন।
তিনি মোট আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিন মেয়াদে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলেজজীবন থেকেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬২ সালে তিনি বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৬৪ সালে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের ভিপি এবং ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। একই সাথে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শীর্ষ নেতা হিসেবে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন।
তিনি ১৯৭১ সালের গণপরিষদের সদস্য এবং ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে হত্যার পর, একই বছরের সেপ্টেম্বরে তোফায়েল আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। সে সময় তিনি দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাগারে কাটান। রাজনৈতিক কারণে তিনি জীবনে অন্তত আটবার কারাবরণ করেছেন।
১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলী (প্রেসিডিয়াম) ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৩-১৪ মেয়াদে গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্পমন্ত্রী এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।
কয়েক বছর আগে তিনি স্ট্রোক করেন, যার ফলে তার শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যায় এবং শেষ জীবনে তাকে হুইলচেয়ারের সাহায্য নিতে হয়েছিল। মৃত্যুকালে তিনি এক কন্যা, জামাতা এবং অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।



