এনসিপির কনভেনশনে অভিমত

সংস্কার নিয়ে সরকার প্রতারণা করছে আন্দোলনই পথ

Printed Edition
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে এসসিপির জাতীয় কনভেনশনে অতিথিরা  : নয়া দিগন্ত
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে এসসিপির জাতীয় কনভেনশনে অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা জানান, নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সরকার ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করছে এবং মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতোই আচরণ করছে। প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না করলে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ না হলে গণ-আন্দোলন হতে পারে।

গতকাল রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে তারা এ কথা বলেন। কনভেনশনে তিনটি পৃথক সেশনে রাজনীতি, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সমাপনী সেশনে সভাপতির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিপ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশন ব্যর্থ হয়েছে। এই অধিবেশনে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকার তা না করে নিজের মতো সংসদ পরিচালনা করেছে। এভাবে চললে জনগণকে সাথে নিয়ে গণ-আন্দোলনই আমাদের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে। সংবিধান পরিবর্তনে গণভোটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেন দলীয়করণ না হয় এবং নিয়োগ যেন প্রধানমন্ত্রীর একক হাতে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের ধারাবাহিকতার নামে আওয়ামী লীগের আদর্শ ফিরিয়ে আনার দরজা খোলা রাখছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে জনগণকে সরকার বিভ্রান্ত করছে। গণভোটের গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেই নোট অব ডিসেন্টসহ কেবল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে প্রতারণা করছে সরকার। ‘দ্রুত নির্বাচনের জন্য বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৭ অক্টোবর আমরা জুলাই সনদে সই করেছি। নভেম্বরের ১৩ তারিখে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার আদেশ হয়েছে। নভেম্বরের ২৫ তারিখে গণভোটের অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি একইসাথে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের আগে আপনারা চার মাস সময় পেয়েছেন, কিন্তু একবারের জন্যও বলেননি যে গেজেট, রাষ্ট্রপতির আদেশ সংবিধানবহির্ভূত, গণভোট মানেন না।

তিনি বলেন, জনগণ বুঝে ফেলেছে, সরকারি দলের ঘাড়ে ভূত চেপেছে, তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। সংসদে তারা ঐকমত্য কমিশনের বই হাতে নিয়ে বলে, আমরা এই জুলাই সনদের সব অক্ষরে অক্ষরে মানব। কিন্তু কোনো দিন তারা বলে না, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে মানব। গণভোট আর জুলাই সনদকে পার্থক্য করে তারা জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশকে নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা জনগণের সাথে অন্তহীন প্রতারণা। এটি যদি অন্তহীন প্রতারণা হয়, তাহলে চার মাস ধরে কেন বলেননি?

তিনি বলেন, ওনারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানবেন, এর অর্থ হলো, গুরুত্বপূর্ণ ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারের মধ্যে ১০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের নোট অব ডিসেন্ট আছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী একই সাথে দলের প্রধান না থাকা, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি, দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক চুক্তি উচ্চকক্ষে অনুমোদনসহ একাধিক বিষয় বলা আছে। এসব বিষয়ে ওনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।

গণভোটে যে চারটি প্রশ্নে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যার অর্থ পাঁচ কোটি মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টকে খারিজ করে সংস্কারের ৪৮টি পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফলে আপনি গণভোটের পক্ষে ভোট চেয়ে এখন তার বিরুদ্ধে কাজ করাই তো অন্তহীন প্রতারণা।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির জায়গা থেকে যখন বলা হয়, আমরা তো নির্বাচন আদায়ের জন্য জুলাই সনদে সই করেছিলাম, আসলে সংস্কারের কোনো ইচ্ছে ছিল না এবং অন্যরা যখন সেখানে সায় দেয়। আমার কাছে তো মনে হয় যে আকাশ ভেঙে পড়া, এটা তো আত্মস্বীকৃত মুনাফেকি।

তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছ থেকে চারটি বিষয় চাই। প্রথত, কোনো যদি কিন্তু ছাড়া, সংবিধানের সংস্কার চাই। তা না হলে আমরা সংবিধান নতুন করে লেখার যে দাবি, সেখানে ফিরে যাবো। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য। যেটির জন্য প্রায় পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাবনা করা হয়েছে জুলাই সনদে। তৃতীয়ত, দলীয়করণ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। চতুর্থত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, হিটলারকে নিয়ে গবেষণা হয়েছিল যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন পপুলার শাসক কিভাবে স্বৈরাচারী হয়ে যান। তখন দেখা যায়, হিটলারের সময়ে আর্থিক সঙ্কটের কারণে রাষ্ট্র যখন ফেল করে তখন তিনি অজনপ্রিয় হয়ে পড়েন। ফলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে স্বৈরতান্ত্রিক হতে হয়। আজকে দুই মাসে আমরা যাদেরকে দেখতে পাচ্ছি, তারা অতীত ভুলে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে চোখ বন্ধ করেই আমি বলতে পারি, বিএনপি যে অর্থনৈতিক পলিসিতে হাঁটছে তাতে নিশ্চিতভাবেই আগামী তিন বছরের মধ্যে তারা স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। আমরা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার একটা ঋণভারে জর্জরিত হতে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ার একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিদ্যুতের সঙ্কট থাকবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অব্যবস্থাপনার কারণে আরো সন্ত্রাসের আশঙ্কা আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিএনপি আরো ৮-১০ মাস পার করলে মানুষ হিসাব করবে ড. ইউনূসের শাসন এবং তাদের শাসনের পার্থক কী? তারপর হিসাব করবে শেখ হাসিনার শাসনামলের সাথে।

উদ্বোধনী সেশনে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ চলতি সংসদকে ‘প্রতারণা ও প্রবঞ্চণার সংসদ’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, সরকার জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আইনগুলো বাতিল করে নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করছে। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণের আইন তারই প্রমাণ।

গুম কমিশন বাতিল এবং পুলিশ কমিশন ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় থেকে বিএনপির সরে আসারও কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ক্ষমতার বাহানায় বিএনপি সরকার আর সংস্কার করতে চায় না। তারা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা উপভোগ করতে চায়। গণভোটের রায়কে অমর্যাদা না করার আহ্বান জানান তিনি।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। বিএনপি সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, আমরা একটা প্রতারণামূলক দলের সাথে কাজ করছি। বাংলাদেশের এলিট ও আমলারা ক্ষমতা ছাড়তে চায় না দেখেই সংস্কার ভণ্ডুল করা হচ্ছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সংসদে দেয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন।

সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান ‘জুলাই সনদকে’ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার অনন্য দলিল উল্লেখ করে বলেন, রাজনৈতিক দলের চাপে অনেক র‌্যাডিক্যাল সংস্কারে আপস করা হয়েছে।

‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’ শীর্ষক সেশনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে গণমাধ্যমের কেবল হাতবদল হয়েছে। যথাযথ আইনি কাঠামোর অভাবে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারীদের এখন ‘হিরো ট্রিটমেন্ট’ দেয়া হচ্ছে।’

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কেবল নির্দিষ্ট মতাদর্শের জন্য নয়, এটি সার্বজনীন। বর্তমানে জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে এবং জুলাই হত্যার তদন্ত শেষ না করেই অনেককে আটকে রাখা হচ্ছে।

গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস জানান, সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে গত ২২ দিনে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে সরকার পুরনো ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের আমলের হাজার হাজার গুমের (আয়নাঘর) বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নইলে বর্তমানরাও একই পথে হাঁটার সাহস পাবে।

জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বদলে এখন সরাসরি মানহানির মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় তাদের এক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, বিচারকরা রোষানলে পড়ার শঙ্কায় জামিন দিতে ভয় পাচ্ছেন।

সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের মন্ত্রী এ আরাফাতের মতোই গঠনমূলক সত্য তথ্যকেও ‘অপতথ্য’ বলে দমন করতে চাইছে। ফ্যাক্ট-চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান বলেন, সরকার কেবল নিজেদের পক্ষে গেলেই ফ্যাক্ট-চেকিং গ্রহণ করে। সাংবাদিকদের আত্মোপলব্ধি ও একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন। সাংবাদিক জায়মা ইসলাম স্বাধীন মিডিয়া কমিশনের খসড়া আইন আলোর মুখ না দেখায় হতাশা ব্যক্ত করেন।

সেশনগুলোর সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আলামিন এমপি ও জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।