নিজস্ব প্রতিবেদক
নোংরা আবর্জনায় পূর্ণ ফ্ল্যাটে জীবনের শেষ দিনগুলো চরম অযতœ ও অবহেলায় কেটেছে নূরজাহান বেগমের। যেখানে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের সাথে হাসিখুশি দিন কাটনোর কথা ছিল, সেখানে তাকে বেছে নিতে হয়েছে একাকিত্ব। তিন ছেলে ও এক মেয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও মায়ের কোনো খোঁজ নিতেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। শেষ বয়সে সন্তানরা মায়ের দেখাশোনা করবেন- এমনটাই হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তা হয়নি নূরজাহান বেগমের জীবনে। শেষ বয়সে তার খোঁজ রাখেনি ছেলেরা। জায়গা হয়নি তাদের বাসায়। মেয়ের বাসায় জায়গা হলেও থাকতে হয়েছে চরম অবহেলা ও অনাদরে।
প্রতিবেশীদের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন একা বসবাস করতেন। বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম সচিব। আরেক ছেলে আশিকুর রহমান বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক। অন্য সন্তান কে এম আতিকুর রহমান কানাডা-প্রবাসী। মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক। সন্তানদের এই অবস্থায় আনতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন নূরজাহান বেগম। তবে শেষ বয়সে তার সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না সন্তানদের।
একজন সফল মায়ের এমন পরিণতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল সমালোচনা। যার সন্তানরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত; তার এমন মৃত্যু অনেকের মনে দাগ কেটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি কি নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে? নিজ ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের পোকা ধরা লাশ উদ্ধার হওয়ার পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মায়ের সাথে একই বাসায় পাশাপাশি রুমে বসবাস করলেও মৃত্যুর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে অবগত করেননি মেয়ে।
স্থানীয়রা জানান, বৃদ্ধার মৃত্যুর পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে নার্সকে আনা হয়েছিল। সেই নার্সই সন্দেহজনক মৃত্যু মনে করে কল দেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ। আর যারা লাশ ধোয়ার কাজ করেছেন তারা জানান, লাশে পচন ধরেছিল। জন্ম নিয়েছিল পোকাও। কয়েকদিন আগে যে মৃত্যু হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। ওই নার্স গণমাধ্যমকে বলেন, লাশ দেখে আমার মনে হয়েছে বৃদ্ধা চার-পাঁচ দিন আগে মারা গেছেন।
আইনি ব্যবস্থা চেয়ে হাইকোর্টে রিট : বৃদ্ধার গলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সাথে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের সুরক্ষায় সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে ‘কেয়ারগিভার’ নিয়োগের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে এতে। গতকাল আইনজীবী মো: শরীফ সরকারের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন। আগামী সোমবার বিচারপতি ফাতেমা নজিবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এই আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।
রিটে অভিযোগ করা হয়, ওই বৃদ্ধার চার সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, মেজো ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং ছোট ছেলে কানাডা-প্রবাসী। এক মেয়ে একই ফ্ল্যাটের পাশের কক্ষে বসবাস করলেও তিনি মায়ের মৃত্যুর খবর পুলিশকে জানাননি। প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও সন্তানরা মায়ের চিকিৎসা ও যতেœ চরম অবহেলা করেছেন, যা প্রাথমিক দৃষ্টিতে অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর শামিল। বৃদ্ধাকে পর্যাপ্ত খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা না দিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখা হয়ে থাকতে পারে, যা সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব, পুলিশের আইজিপি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং পল্লবী থানার ওসি-সহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদি করা হয়েছে।
ব্যাখা চেয়ে চার সন্তানকে আইনি নোটিশ : এই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় তার চার সন্তানের উদ্দেশে বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (রাখি) আইনি নোটিশ পাঠানো পাঠিয়েছেন। নোটিশে বলা হয়, ঘটনাটি শুধু পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক নৈতিকতা এবং আইনের শাসনের সাথে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



