নয়া দিগন্ত ডেস্ক
আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে দুর্বল শ্রমবাজার এবং জ্বালানির উচ্চ দামের মিশ্রণ রিপাবলিকানদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হচ্ছে। বিষয়টিকে বিশ্লেষকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বিপজ্জনক অভিহিত করে বলছেন, রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি হোঁচট খেতে পারে।
মার্কিন শ্রম বিভাগের হিসাব বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ৯২ হাজার লোকবল ছাঁটাই করার পর বেকারত্বের হার ৪.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সাথে ইরানের সাথে যুদ্ধে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারে উঠে যাওয়ার পর অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এসব ধাক্কার সংমিশ্রণ অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে।
দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং মার্কিন শ্রম বিভাগের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর নেতৃত্বদানকারী ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ ই জে অ্যান্তোনি ছাঁটাইকে উদ্বেগ অভিহিত করে বলেন, পরিস্থিতির ওপর চিনির আবরণ দেয়ার কোনাে উপায় নেই এবং নি¤œগামী সংশোধনগুলো এখনো স্থির হয়নি। দুর্বল শ্রমবাজার এবং উচ্চ জ্বালানির দামের সংমিশ্রণ আগামী মাসগুলোতে রিপাবলিকানদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করবে কারণ প্রশাসন অর্থনীতিতে ট্রাম্পের অনুমোদনের রেটিং মেরামত করার চেষ্টা করছে।
হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা গ্যাসের দাম কমানোর উপায় খুঁজছেন। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইতোমধ্যে রুশ তেলের বিষয়ে ভারতীয় জ্বালানি প্রস্তুতকারকদের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। দীর্ঘস্থায়ী তেলের ধাক্কা ভোক্তাদের দাম বাড়ানোর ঝুঁকি সৃষ্টি করে মুদ্রাস্ফীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করে - এবং এটি ফেডারেল রিজার্ভ কর্মকর্তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি খরচ কমানো আরো কঠিন করে তুলবে।
ফেড গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার ব্লুমবার্গ টিভিকে বলেছেন, তেলের দামের সাম্প্রতিক উত্থান যদি “আরো স্থায়ী হয়ে ওঠে”, তবে তা অর্থনীতির অন্যান্য অংশেও রক্তপাত শুরু করবে। কারণ জালানি শক্তি অন্য সবকিছুতে প্রভাব ফেলে। এমনিতে ট্রাম্পের নির্বাচনের পর সরকারি বেতন গত অক্টোবর থেকে প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, অবসর ও আতিথেয়তা। ইওয়াই-পার্থেনন-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বলেন, মুদ্রাস্ফীতির স্থবিরতা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হয়ে ওঠার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহের ধাক্কায় মার্কিন অর্থনীতি অভিবাসন বিধিনিষেধ, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তেলের দাম বৃদ্ধির আকারে টিকে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কার চলাচলের মৌলিক সমস্যাটি ট্রাম্প প্রশাসন এখনো সমাধান করতে পারেনি। ইরানের ওপর হামলা শুরু করার এক সপ্তাহ পরেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি রোধে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা এখনো কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি গ্যাস পাম্পে দাম এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রতি গ্যালনে ৩২ সেন্ট বেড়েছে।
কমোডিটি কনটেক্সট নিউজলেটারের তেলবিশ্লেষক রোরি জনস্টন বলেছেন, হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক চলাচল পুনরায় শুরু না হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ২০০ ডলার [প্রতি ব্যারেল] ছাড়িয়ে যাবে। হোয়াইট হাউজের হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কারগুলিকে নৌ-প্রহরী এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা প্রদান কাজে আসছে না। ইরান বেশ কয়েকটি তেল ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত করতে সফল হয়েছে। ইরাক ও কুয়েত ইতোমধ্যেই তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে কারণ তাদের অপরিশোধিত ট্যাঙ্কারগুলো আর বাজারে যেতে পারছে না এবং চীন সরবরাহের উদ্বেগে জ্বালানি রফতানি বন্ধ ঘোষণা করেছে।
গবেষণা সংস্থা রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গ্যালিমবার্তি বলেন, যত বেশি সময় ধরে জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে চলবে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ধারণক্ষমতা ফুরিয়ে যাবে এবং তাদের উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে। হরমুজ প্রণালী তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিদিন ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ হবে এবং তেলের অবিশ্বাস্য ঘাটতির দিকে নিয়ে যাবে, যা আমরা কখনো দেখিনি। কারণ তেল উৎপাদন পুনরায় শুরু কঠিন এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। যদি এটি সপ্তাহ বা মাস ধরে বন্ধ থাকে তবে এটিকে একই স্তরে ফিরিয়ে আনতে সপ্তাহ থেকে এক মাস সময় লাগবে।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, রেকর্ড মার্কিন তেল উৎপাদন, ভেনিজুয়েলা থেকে নতুন সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর প্রচেষ্টা তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। তবে বাজার বিশ্লেষকরা পরিস্থিতির আরো ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছেন। সংঘর্ষের ছয় দিন পরও, ২০ বিলিয়ন ডলার বীমা প্রদানের আশ্বাস সত্ত্বেও তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কারগুলো প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে অনিচ্ছুক, যার ফলে উপসাগরের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এশিয়া এবং তার বাইরে তাদের গ্রাহকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আরব উপসাগরীয় রাজ্য ইনস্টিটিউটের তেল বিশ্লেষক বেন কাহিল বলেন, ইরানিরা প্রতিশোধ নিতে স্পষ্টতই মরিয়া বলে বীমা প্রদানের বিষয়টিতে আস্থা পাওয়া যাচ্ছে না।
পণ্য ট্র্যাকিং ফার্ম কেপলারের তেল ও ট্যাঙ্কার গবেষণার পরিচালক অ্যান্ডন পাভলভ বলেন, এই সপ্তাহে দাম বৃদ্ধি পেলেও, প্রণালী বন্ধের প্রকৃত প্রভাবে বাজারগুলি মূল্য নির্ধারণ নাও করতে পারে। মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের জলবায়ু ও জ্বালানি অর্থনীতির প্রাক্তন উপ-সহকারী সচিব ক্যাথেরিন উলফ্রাম বলেন, পেট্রোলের দাম কমবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমআইটি স্লোয়ান স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের জ্বালানি অর্থনীতির অধ্যাপক উলফ্রাম বলেন, তেলের দাম বাড়লে গ্যাসের দাম রকেটের মতো বেড়ে যায়।
এ দিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের কেবল প্রথম চার দিনে খরচ হয়েছে ১১০০ কোটি ডলার। পেন্টাগন ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে বাজেট সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করতে কংগ্রেসের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।


