আমিনুল ইসলাম
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনার সাথে জড়িতদের সন্দেহের তালিকায় প্রধান অবস্থানে রয়েছে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের নাম। সময়ের সব থেকে সুবিধাভোগী ঢাকার ‘সিটি অব গড’খ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সাথে চাঁদাবাজি, অধিপত্য বিস্তার, দখলবাজি নিয়ে বিরোধ ছিলো টিটনের, যা তীব্র আকার ধারণ করে আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। আর এই বিরোধের কারণেই টিটনকে হত্যা করা হতে পারে বলে অভিযোগ করছে তার পরিবার।
এ দিকে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা একে একে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠছে অপরাধ জগৎ। বিশেষ করে টিটুন হত্যাকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। যদিও এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিন বাতিল করতে পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছিলো; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। উল্টো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে বেরিয়ে নিজেদের বেদখল হওয়া সাম্রাজ্য পুনঃদখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যার কারণে ঘটতে থাকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। তাদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন নগরবাসী। এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বি-গ্রুপ হিসেবে নতুন আঙ্গিকে গড়ে ওঠেছে কিশোর গ্যাং।
সম্প্রতি কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, বসিলা, গাবতলীসহ কয়েকটি এলাকার পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু হয়েছে শক্তি পরীক্ষা। পিচ্চি হেলালের নজর পুরো এলাকার দিকে; কিন্তু সেখানে হস্তক্ষেপ করেন টিটন। অভিযোগ রয়েছে পিচ্চি হেলাল প্রথম দিকে টিটনকে সাথে নিয়েই হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণে স্বার্থের ভাগ দিবেন না বলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করছেন টিটনের পরিবার।
ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বলেন, টিটন হত্যায় নিউ মার্কেট থানায় একটি মামলা করেছেন। এতে আসামি হিসেবে কারো নাম উল্লেখ না করলেও তিনি সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলাল ও তার তিন সহযোগী বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করেন। সম্প্রতি তাদের সাথে কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের বিরোধ চলছিল। টিটন হত্যার তিন দিন আগে তার সাথে শেষ দেখা হয়। সে দিন টিটন জানিয়েছিলেন, গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলালের সাথে বিরোধ চলছিল। তবে পিচ্চি হেলালের সাথে একটি সমঝোতা হয়েছে। রিপনের ধারণা টিটনকে ভাগ দিবে না বলেই বিশেষ সুবিধায় থাকা পিচ্চি হেলাল তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
রিপন বলেন, ইমনের সাথে টিটনের কোনো খারাপ সম্পর্ক নেই। হত্যাকারীরা নিজেদের বাঁচাতে ইমনকে জড়ানোর চেষ্টা করছে। ইমন তাদের ভগ্নিপতি। ইমনের সাথে কোনো বিরোধ নেই। মোহাম্মদপুর অঞ্চলের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার আসামি টিটন। এ জন্যও তিনি জোসেফকে সন্দেহ করছেন। তবে কে বা কারা, কেন টিটনকে হত্যা করেছেন, সেটি আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী বের করবে।
অভিযোগ রয়েছে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারদলীয় একজন উচ্চ পর্যায়ের নেতার নির্দেশনায় একে একে জামিনে বের হতে থাকেন ২০০১ সালের ঘোষিত তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। এরপর নিজেদের সাম্রাজ্যের দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন; কিন্তু ততদিনে তাদের সাম্রাজ্যের দখল চলে গেছে অন্যদের হাতে। এই নিয়ে শুরু হয় খুনাখুনি। দ্রুত অবনতি হতে থাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বাধ্য হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন বাতিল চেয়ে আবেদন করা হয়; কিন্তু বিএনপির এক নেতার হস্তক্ষেপে সেই আবদনে সাড়া দেয়নি সংশ্লিষ্টরা। জামিনে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে শক্ত অবস্থানে চলে যান পিচ্চি হেলাল। সরকারদলীয় উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সাথে ফটোসেশন করে আন্ডারওয়ার্ল্ডে জানান দিয়েছেন তার অবস্থান। তিনি কার সাথে ওঠাবসা করছেন, কার শেল্টারে রয়েছেন তা প্রকাশ করে একাই রাজত্ব হাসিলের চেষ্টা করছেন।
টিটন হত্যার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিশ্চিত না হয়ে পুলিশ কারো ওপর দায় চাপাতে চায় না। তাই ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে সেসব বিশ্লেষণের কাজ চলছে। ঘটনাস্থলের মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যালের সাথে কিছু সম্পৃক্ততা রয়েছে। সেগুলোও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, থানা পুলিশের পাশাপাশি তারা ছায়া তদন্ত শুরু করেছেন। সোর্সের পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে শিগগিরই জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টায় রাজধানীর নিউ মার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ বলছে, টিটনকে গুলির ঘটনায় দু’জন জড়িত। একজন গুলি করেছেন, অপরজন মোটরসাইকেল চালক। দু’জনের মুখেই মাস্ক ছিল। গুলি করার পর মোটরসাইকেলে করে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। টিটনের কপাল, মাথা, ঘাড়সহ শরীরে ছয়টি গুলি করা হয়।



