নিজস্ব প্রতিবেদক
ঈদের ছুটির পর দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে গতকাল লেনদেন শেষ হয়েছে। একই সাথে টাকার অঙ্কে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে ৬০০ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিন শেষে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩১ দশমিক ২৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩১৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ১ দশমিক ০৫ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৩ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ সূচক ডিএস-৩০ বেড়েছে ৮ দশমিক ২৫ পয়েন্ট, যা দিন শেষে ২ হাজার ১৯ পয়েন্টে স্থির হয়েছে।
গতকাল দিনের শুরু থেকেই সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায় এবং শেষ পর্যন্ত তা বজায় থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেনের শুরুতে সূচক বাড়লেও শেষদিকে পতনের যে প্রবণতা ছিল, বুধবার তা দেখা যায়নি। ফলে সারাদিন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ করা গেছে।
গতকাল ডিএসইতে মোট ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ ৪৮ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৪৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার, যা থেকে প্রায় ১১১ কোটি টাকা বেশি। এই বৃদ্ধি বাজারে নতুন করে তারল্য প্রবাহের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৪১টির দর বেড়েছে। বিপরীতে ১০২টির দর কমেছে এবং ৪৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি বিক্রেতাদের তুলনায় বেশি ছিল।
লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কিছুর শেয়ারে ক্রেতার চাপ এতটাই বেশি ছিল যে, বিক্রেতার সঙ্কট দেখা দেয়। ফলে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ‘হল্টেড’ অবস্থায় চলে যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল মিউচ্যুয়াল ফান্ড। ইবিএল এনআরবি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, হামিদ ফেব্রিক্স ও বিডি থাই অ্যালুমিনিয়ামের শেয়ারদরও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে বাজারে নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সূচকের উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের কয়েকটি শীর্ষ কোম্পানি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে সূচকে উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট যোগ হয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ও স্কয়ার ফার্মা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে।
তবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২৪ দশমিক ৪১ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৯২৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এছাড়া সিএসসিএক্স সূচক ৮ দশমিক ০৭ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ১১০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সিএসইতে লেনদেন হওয়া ১৭৪টি কোম্পানির মধ্যে ৯৪টির দর বেড়েছে, ৫৯টির কমেছে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। দিন শেষে সেখানে মোট লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি ৬ লাখ টাকার, যা আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেশি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছুটির পর বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে বাজারে ফিরছেন। একই সাথে কিছু কোম্পানির সম্ভাব্য ডিভিডেন্ড ঘোষণা ও আর্থিক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে বাজারে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা কাজ করছে।
এদিকে, চলতি মাসের শেষ দিকে কয়েকটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ডিভিডেন্ড ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব প্রত্যাশাও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা জরুরি বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদি উত্থান-পতনের বাইরে গিয়ে বাজারকে টেকসই ধারায় ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতকাল লেনদেন পুঁজিবাজারে আস্থার আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও তা কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের বাজার প্রবণতা ও নীতিগত সহায়তার ওপর।



