তারেক রহমানকে ঘিরে বিএনপিতে প্রশ্নের ঘূর্ণাবর্ত

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কবে দেশে ফিরবেন- এ প্রশ্ন এখন জাতীয় রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় অনিশ্চয়তা। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বহুদিনের অপেক্ষা ক্রমেই অস্থিরতায় রূপ নিচ্ছে। বিএনপি নেতারা বলছেন- তারেক রহমান শিগগিরই দেশে ফিরবেন; অন্তর্বর্তী সরকার তার নিরাপত্তার বিষয়ে বুলেটপ্রুফ গাড়িসহ সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু তারেক রহমান নিজেই সাম্প্রতিক ফেসবুক স্ট্যাটাসে ইঙ্গিত দিয়েছেন- দেশে ফেরা সম্পূর্ণ তার একক নিয়ন্ত্রণাধীন সিদ্ধান্ত নয়।

তারেকের নিয়ন্ত্রণে বাইরের কোন শক্তি?

দলের শীর্ষ নেতৃত্বও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না- কোন ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘শর্ত’ তার দেশে ফেরা বিলম্বিত করছে। এ দিকে মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী আমেজ বাড়ছে; টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিএনপির তৃণমূল নেতারা সরাসরি বলছেন- তারা চান তারেক রহমান দ্রুত দেশে ফিরুন, অসুস্থ মায়ের পাশে দাঁড়ান এবং বাবা জিয়াউর রহমানের মতো আবার মাঠঘাট চষে দেশের মানুষের সাথে মেলামেশা করুন।

তাদের বিশ্বাস- ১৮ কোটি মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরির সবচেয়ে বড় সুযোগ এখন নির্বাচন। দেরি করলে রাজনৈতিক অ্যাডজাস্টমেন্টেও সমস্যা হবে।

কোনো আইনি বাধা নেই- কিন্তু আসছেন না কেন?

অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার জানিয়েছে- তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। চাইলে তিনি লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ট্র্যাভেল পাস নিতে পারেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে- ট্র্যাভেল পাস ইস্যুর সব প্রস্তুতি আগেই নিয়ে রাখা আছে; বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কারো অনুরোধ এলে সেটিও দ্রুত দেয়া হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- রাজনৈতিক আশ্রয়ে যুক্তরাজ্যে থাকা কোনো ব্যক্তির জন্য জন্মভূমিতে ফেরার ক্ষেত্রে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র সাধারণত বাধা দেয় না। তাই যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আশ্রয় তার দেশে ফেরা ঠেকানোর একমাত্র কারণ হতে পারে না।

নাগরিকত্বের বিতর্ক : তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে বিদেশী নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে হবে। সংবিধানের ৬৬(২)(গ) ও ৬৬(৩ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হলেও সংসদ সদস্য হতে চাইলে বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগ করা বাধ্যতামূলক।

সবার আগে বাংলাদেশ- রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়েও বেশি কিছু

তারেক রহমানের উচ্চারিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগান নয়, জাতির প্রতি এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার। জিয়াউর রহমানের পরিবার জাতীয় ইতিহাসে ত্যাগ, সাহস ও রাষ্ট্রসুরক্ষার প্রতীক। ১৯৭১-এ মৃত্যুঝুঁকির মধ্যেও জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছিল।

তারেক রহমানও আজ এক অনুরূপ ইতিহাসের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে- যেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারিবারিক আবেগ, বিদেশী শর্ত- সবকিছুর ওপরে রয়েছে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।

নির্বাচনের আগে না ফিরলে রাজনৈতিক মূল্য ভয়াবহ : আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন। এমন সময় অতীতের মতো আবারো জাতির ভাগ্য নির্ধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ১৯৭৫-এ জিয়াকে যেমন ইতিহাস সামনে নিয়ে এসেছিল, তেমনি আজ তারেক রহমানও এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে।

  • কিন্তু তিনি লন্ডনে থাকলে-
  • জনমানুষের সাথে দূরত্ব বাড়বে
  • বিএনপি আস্থাহীনতার সঙ্কটে পড়বে
  • প্রতিপক্ষের অপপ্রচার আরো জায়গা পাবে

এমনকি দলীয় নেতাকর্মীরাও প্রশ্ন তুলছেন- ‘খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ, অথচ তারেক রহমান দেশে ফিরছেন না কেন?’

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার যুক্তি যদি তাকে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়, তা হলে নির্বাচিত হলে ১৮ কোটি মানুষের নিরাপত্তা তিনি কিভাবে নিশ্চিত করবেন- এই প্রশ্ন এখন ভোটারদের মনেও।

কানাঘুষা : তাহলে কি কখনোই ফিরবেন না?

বিএনপির ভেতরে কানাঘুষা-

  • নির্বাচনের আগে হয়তো ফিরবেন না,
  • বিএনপি না জিতলে আর কখনো ফিরবেন না,
  • খালেদা জিয়াকে তিন আসনে প্রার্থী করায় নেতাদের ধারণা- তারেক রহমান সম্পূর্ণ আস্থায় কাউকে দায়িত্ব দিতে পারছেন না।

গত দেড় বছরে শীর্ষ নেতাদের ভুলে দলের যে ইমেজ ক্ষতি হয়েছে, সেটি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফেয়ার নির্বাচন হলে বিএনপি ‘অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা’র চাপে উল্টো সমস্যায় পড়তে পারে।

দলটির মতে- নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড তারেক রহমান। তিনি দেশে ফিরলে নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি মুহূর্তেই বদলে যাবে।

কিন্তু কোনো শক্তি তাকে আটকে রেখেছে?

পরিবর্তিত ভূরাজনীতির ছায়ায় একাধিক দেশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়েছে- যা বিএনপির বিরুদ্ধবাদীরা প্রচার করছে। এর অনেকটাই অতিরঞ্জিত, কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে- কারা বা কোন শক্তি তারেক রহমানকে দেশে ফিরতে বাধা দিচ্ছে? অন্তর্বর্তী সরকার?, রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান? আদালত? বিএনপির ভেতরে কোনো গোষ্ঠী? নাকি কোনো বিদেশী শক্তির চাপ?

তারেক রহমানের দেয়া ‘রহস্যঘেরা’ ব্যাখ্যায় জনমনে বিস্ময় আরোবেড়েছে।

জনগণের চাওয়া- স্পষ্ট উত্তর নির্বাচনের আগে জনগণ জানতে চায়- তিনি কি নিজের সিদ্ধান্তের মালিক? নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তি তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে?

নিজ মায়ের শয্যার পাশে যেতে না পারলে, রাষ্ট্রীয় সঙ্কটকালে তিনি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন- এমন প্রশ্ন এখন ভোটারদের মনেও।

একজন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী যদি নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও নির্ভরশীল থাকেন অন্য কারো ওপর, তাহলে দেশকে আধুনিক ও সমৃদ্ধির পথে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।