- মাউশি ও এনসিটিবিতে বঞ্চিতদের ক্ষোভ
- সিনিয়র ডিঙিয়ে একাধিক জুনিয়রকে পদায়ন
নিয়ম ভঙ্গের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে শিক্ষা প্রশাসনে। বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরে আওয়ামী দু:শাসনের যাতাকলে যারা পৃষ্ঠ ছিলেন তারা এখনো বঞ্চিত হচ্ছেন নানাভাবে । গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রত্যেকেরই আশা ছিল শিক্ষা প্রশাসনে এবার শৃঙ্খলা ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে উল্টো। দেখা যাচ্ছে নিয়ম ও বিধি লঙ্ঘন করে পদায়ন আর পদোন্নতিতে শিক্ষা প্রশাসন ক্রমেই আরো বেশি বেসামাল হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কয়েকটি পদে নতুন পদায়ন নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। গত কয়েক দিনে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে পুরো শিক্ষা প্রশাসনেই এখন নীরব হতাশা আর ক্ষোভ বিরাজ করছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন থেকে শিক্ষার সব সেক্টরেই ক্রমান্বয়ে বদলি আর পদায়নের কাজ শুরু হবে, হতাশার কিছু নেই। সিনিয়র কর্মকর্তাদেরও তাদের যোগ্যতা ও প্রাপ্ততা অনুযায়ীই পর্যায়ক্রমে বদলি বা পদায়ন করা হবে।
সূত্র জানায়, মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এখানকার মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলকে গত ১৬ এপ্রিল দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদিও তিনি শিক্ষা ক্যাডারের ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তা। অন্যদিকে সেখানে শিক্ষা ক্যাডারের ১৪ ব্যাচের কর্মকর্তা আবু কাইয়ুম শিশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বিধিমোতাবেক এবং সিনিয়রিটির বিবেচনায় আবু কাইয়ুম শিশির মাউশির ডিজি পদে নিয়মিত পদোন্নতি কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবেই এই পদে পাওয়ার কথা ছিল। অপরদিকে বিকল্প হিসেবে মাউশির ডিজি পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেতে পারতেন আগের রীতি অনুযায়ী কলেজ প্রশাসন শাখার পরিচালক। সম্প্রতি মাউশির কলেজ প্রশাসনের পরিচালক অধ্যাপক বি এম আবদুল হান্নানকেই ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি তাকে ওএসডি করা হয়েছে। এর আগে নিয়মিত পদে থাকা ডিজি প্রফেসর আযাদ খান ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার পর প্রফেসর এ এম আব্দুল হান্নাকে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে বর্তমানে কলেজ প্রশাসনের দায়িত্বে আসা নাজমুল হোসেনকেও আগের রীতি মেনেও দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এটা নিয়েও অনেকে প্রকাশ্যেই কানাঘুষা শুরু করছেন। অনেকে বলেছেন এভাবে পদায়ন পদোন্নতি দেয়া হলে কাজের পরিবেশ নষ্ট হবে। কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের স্পৃহা কমে যাবে।
একই পথে হাঁটছে এনসিটিবিও। সম্প্রতি সেখানেও সিনিয়র কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দিয়ে উপরের পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর এসব প্রতিটি আদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেই জারি করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ১৮ শিক্ষা ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর আবু নাসের টুকুকে। অথচ এখানে বিসিএস শিক্ষার ১৬ ব্যাচের অনেক কর্মকর্তাও রয়েছেন। বিশেষ করে প্রধান সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালন করছেন বিসিএস ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর ফাতিহুল কাদীর সম্রাট। একইভাবে বর্তমানে এনসিটিবিতে সদস্য (অর্থ) হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন আজীজ হায়দার ভূঁইয়া। তিনি বিসিএস ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। অথচ একই বিভাগে নিচের পদের (প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা) দায়িত্বে রয়েছেন বিসিএস শিক্ষার ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর নজরুল ইসলাম। এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) পদে দায়িত্বে রয়েছেন আত্মীকৃত ক্যাডার প্রফেসর ড. এ কে এম মাসুদুল হক। যিনি ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরিতে স্থায়ী হয়েছেন। এর আগে তাকে ভুতাপেক্ষভাবেই বেসরকারি কলেজ থেকে ২০০৬ সালের ১৫ জুন তারিখে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে আত্মীকৃত করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, এনসিটিবিতে অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ১৬ এবং ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তা। কারিকুলাম, প্রাথমিক, সম্পাদনা, প্রশাসন ও অন্যান্য বিভাগ মিলে এনসিটিবিতে ৬৫ থেকে ৭০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন যারা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের । অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে এভাবে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে জুনিয়রদের ওপরের পদে পদোন্নতি দেয়ার বিষয়ে অবৈধভাবে অন্তরালের কোনো ঘটনা রয়েছে কিনা সেই বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
মাউশিতে এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই মূলত আলোচনা সমালোচনা এখন তুঙ্গে। মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলকে ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়ার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে মাউশি কি এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে ? কেননা একমাত্র ব্যক্তিই এখন পরিচালক মাধ্যমিক, ডিজিরও অতিরিক্ত দায়িত্বে । তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পিএ (অবশ্য ব্যাপক সমালোচনার আশঙ্কায় সম্প্রতি ওই পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন) এই একই ব্যক্তি। আর শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিসের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কর্ণধার হিসেবে রয়েছেন এই একই ব্যক্তি। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন পেশাদার সংগঠনের প্রধান কর্তাব্যক্তি হিসেবে তার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে পদোন্নতি পদায়নে সরকারের সাথে বার্গেনিং করা এবং সবাইকে যে যার যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়নে সহায়তা করা। অথচ তিনি করছেন উল্টোটা যেন বানরের পিঠা ভাগের মতো হয়ে গেছে।
এসব বিষয়ে পদোন্নতি বঞ্চিতদের সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে কেউই চাকরি বিধি এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে সরাসরি কথা বলছেন না। তবে প্রত্যেকের মনের তীব্র ক্ষোভ আর হতাশার কথা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সদিচ্ছা ও ভালো কিছু করার পরিকল্পনা থাকার পরেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কিভাব এমন বৈষম্য ও বিভেদের মতো আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্ত আসছে সেটা বোধগম্য নয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে বৈষম্যহীন প্রশাসন পরিচালনায় জোর দিচ্ছেন সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব সিদ্ধান্ত কিসের বার্তা দিচ্ছে ?



